সুস্থ্য সবল কোরবানির পশু চেনার উপায়

তথ্যভিত্তিক ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

আবদুর রহমান (রাফি):মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ। আরবি যিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ পবিত্র ঈদুল আযহা পালন করা হয়ে থাকে। সে হিসেবে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে এবছর মে মাসের ২৭ বা ২৮ তারিখ বাংলাদেশের মানুষ ঈদুল আযহা উদযাপন করবে।

ঈদুল আযহার অন্যতম একটি আনুষ্ঠানিকতা হলো পছন্দের পশুকে কোরবানি করা। মুসলিমদের এই উৎসবে সামর্থ্যবানরা পছন্দমতো পশু কোরবানি দিয়ে আল্লাহর কাছে তার তাকওয়া প্রদর্শন করে। সামর্থ্যবানদের কোরবানির মাংসের একটি অংশ থাকে গরিবদের জন্য। আর এই কোরবানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল সুস্থ ও সবল পশু নির্বাচন করা। 

সারাদেশে ১ কোটিরও বেশি পশু কোরবানিতে জবেহ করা হয়। সবাই ভালো পশুটিই পছন্দ করতে চায়, এজন্যে সবার নজর থাকে গরুর স্বাস্থ্যের প্রতি। কোরবানির পশু সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত কিনা তা চিনতে হলে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে:

১) সুস্থ্য পশুর চোখ উজ্জ্বল ও তুলনামূলক বড় আকৃতির হবে। অবসরে জাবর কাটবে (পান চিবানোর মতো), কান নাড়াবে, লেজ দিয়ে মাছি তাড়াবে। বিরক্ত করলে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সহজেই রেগে যাবে। অন্যদিকে, অসুস্থ গরু প্রতিক্রিয়া দেখাবে না, আশেপাশের কোলাহলে সাড়া দেয় না, বসে বসে ঝিমাবে। 
২) সুস্থ গরুর নাকের সামনের কালো অংশ বা মাজল ভেজা থাকবে, অসুস্থ গরুর ক্ষেত্রে শুকনো থাকবে। এছাড়া অসুস্থ গরুর শরীরের তাপমাত্রা বেশি থাকে।
৩) সুস্থ গরুর প্রস্রাব ও গোবর স্বাভাবিক থাকবে, পাতলা পায়খানার মতো হবে না।
৪) সুস্থ গরুর সামনে খাবার এগিয়ে ধরলে জিহ্বা দিয়ে তাড়াতাড়ি টেনে নিতে চাইবে। অপরদিকে অসুস্থ পশু ভালোমতো খেতে চাইবে না।
৫) কোরবানিকে কেন্দ্র করে অসাধু কিছু ব্যবসায়ী স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করে দ্রুত গরু মোটাতাজাকরণের দিকে ঝুঁকছে। স্টেরয়েড দিয়ে মোটাতাজা করা গরু স্বাস্থ্যবান দেখাবে কিন্তু এরা তেমন চটপটে হবে না। খুব বেশি নাড়াচাড়া করতে দেখা যাবে না। গরুর শরীরে আঙ্গুল দিয়ে হালকা চাপ দিলে ঢেবে যাবে। কিন্তু সুস্থ গরুর শরীরে আঙ্গুলের চাপ দিয়ে আঙ্গুল সরিয়ে নিলে তাৎক্ষণিকভাবে পূর্বের অবস্থায় ফেরত আসবে। 
৬) কোরবানির পশু কেনার আগে পশুকে হাঁটিয়ে দেখতে হবে পশুটি খোঁড়া বা রোগাক্রান্ত কিনা। সুস্থ্য পশুর হাঁটা ও চলাচল স্বাভাবিক থাকবে এবং শরীরে কোনো আঘাত বা ইনজুরির চিহ্ন থাকবে না। 

কোরবানির জন্য দেশে গরু,মহিষ, ছাগল প্রভৃতি পশু বা প্রাণীর চাহিদা ব্যাপক। পূর্বে প্রতিবেশী দেশ থেকেও অনেক পশু আমদানি করা হতো, তবে বর্তমানে বাংলাদেশের খামারীরা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে এ চাহিদা পূরণ করেছে, যার ফলে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পশু আমদানি হয় না। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, কোরবানির উপযুক্ত প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ পশু রয়েছে, যা চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত। পশু ক্রয় থেকে শুরু করে মাংস ভক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে সর্বক্ষেত্রে। রোগব্যাধির প্রকোপ বেশি হলে প্রাণী চিকিৎসকদের (রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ান) পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।

কোরবানির পশু কেনার পর আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষই পশুর প্রতি বেশি দরদ দেখাতে গিয়ে জবাইয়ের পূর্বে বেশি করে খাবার খাওয়ানোর প্রবণতা দেখা যায়, যা বিজ্ঞানসম্মত নয়। এতে করে মাংসের গুণগত মান কমে যেতে পারে৷ পশু জবাইয়ের ১২ ঘণ্টা পূর্ব থেকে পশুকে কোনো খাবার না দেওয়াই ভালো এবং বেশি করে পানি খাওয়াতে হবে৷ এতে করে চামড়া ছাড়ানো সহজ হবে৷ পশু জবাইয়ের পরপরই পশুর রক্ত ও আবর্জনা পরিষ্কারের ব্যাপারে সবাইকে আরো সতর্ক হতে হবে। এতে করে আমাদের পরিবেশ ভালো থাকবে এবং সর্বোপরি একটি উৎসবমুখর ঈদ উদযাপন করতে পারবো।  

-লেখক: প্রভাষক, ডেইরি বিজ্ঞান বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়