বি. এইচ. খান : স্মার্ট, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, অধিক লাভজনক এবং বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, জলবায়ু সহনশীল কৃষি উন্নয়নে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসল উৎপাদন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মাঠ পর্যায়ের কৃষিতে টেকসই প্রযুক্তির বিস্তার ঘটাতে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে পার্টনার ফিল্ড স্কুল (পিএফএস) কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়।
গতকাল সোমবার (১৫ জুন) কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আয়োজিত প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল এন্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউটিশন এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার) প্রকল্পের আওতায় উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা- খায়রুন্নাহারের সভাপতিত্বে এক বিশাল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় কংগ্রেসে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের রূপরেখা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়। । অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন, উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো: কিশোর আহমেদ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন, মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষন কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মতিউর রহমান, উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) মো: হাবেল উদ্দিন ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলাউদ্দিন, উপকার ভোগী কৃষক আলী হোসেন ও কৃষাণী সাবিনা আক্তার প্রমূখ। বক্তারা বলেন, কৃষকের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে পার্টনার প্রকল্পের আওতায় ফিল্ড স্কুল, উত্তম কৃষি চর্চা, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি, মানসম্মত তথ্য ব্যবস্থাপনা ও ফার্মার্স সার্ভিস সেন্টার চালু করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল চাষাবাদ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং কৃষিকে লাভজনক বাণিজ্যিক পেশা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে বক্তারা।
অতিথিগণ বক্তব্যে আরও বলেন, 'পার্টনার কংগ্রেস' হলো অত্র প্রকল্পের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক আয়োজিত একটি সমাবেশ বা মিলনমেলা। এর মূল লক্ষ্য মাঠপর্যায়ের কৃষকদের নিরাপদ, আধুনিক ও লাভজনক কৃষি প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং কৃষিকে উৎপাদনমুখী থেকে স্মার্ট ও বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর করা। দিনদিন আমরা অতিরিক্ত ও অনিরাপদ খাবার গ্রহণ করার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। এতে খাবার গ্রহণের চেয়ে চিকিৎসা ব্যয় অনেকগুণে বেড়ে গেছে। এই জন্য উত্তম কৃষি চর্চার (GAP) মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও গ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল বিষমুক্ত ও পুষ্টিকর খাবারই নিশ্চিত করে না, বরং মানবস্বাস্থ্য, মাটি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে কৃষিকে টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করে।
অনুষ্ঠানে তৃণমূলের কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ কংগ্রেসে কৃষিকে আরও লাভজনক, প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই খাতে রূপান্তরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি থেকে প্রণীত বাস্তবায়ন নির্দেশিকা অনুযায়ী আয়োজিত এ কংগ্রেসে দেশের কৃষি খাতকে আরও বাণিজ্যিক, লাভজনক ও টেকসই করতে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষকদের অর্জিত জ্ঞান ও প্রযুক্তি দ্রুত সাধারণ কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া, আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসল উৎপাদন ও কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রতিটি পিএফএসকে স্বনির্ভর ‘ফার্মার সার্ভিস সেন্টার’-এ রূপান্তর করা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নিশ্চিত করা। কৃষক-কৃষাণিরা আধুনিক চাষাবাদ, কম খরচে অধিক ফলন এবং পরিবেশবান্ধব বালাইনাশক ব্যবহারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তারা নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক কৃষিযন্ত্র ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন ফসল উৎপাদনের বৈজ্ঞানিক দিক সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেন। কৃষি খাতকে একটি মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
কী- নোট আরোচনায় জানান- আইল ফসল, ইঁদুর ব্যবস্থাপনা, পোকার চিড়িয়াখানা, বীজ, বীজের স্বাস্থ্য ও ভাল বীজের বৈশিষ্ট্য, জৈব কৃষি, পোকা দমনে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ, উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ ও বংশ বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে বায়োএজেন্ট বৃদ্ধি, উদ্ভিদের বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের কাজ ধান ফসলে সার ব্যবস্থাপনা , ধান ক্ষেতে পানি ব্যবস্থাপনা, ধানের প্রধান প্রধান ক্ষতিকর পোকা ব্যবস্থাপনা,মাজরা পোকা ব্যবস্থাপনা,বাদামী গাছ ফড়িং ব্যবস্থাপনা, পাতা মোড়ানো পোকা, ধানের পামরি পোকা ব্যবস্থাপনা, চুংগী পোকা ব্যবস্থাপনা,গান্ধী পোকা ব্যবস্থাপনা, শীষ কাটা লেদাপোকা ও লেদাপোকা ব্যবস্থাপনা, ধানের নলি মাছি,ধানের প্রধান প্রধান রোগসমূহ ব্যবস্থাপনা, খোল পোড়া রোগ ব্যবস্থাপনা, খোলপচা রোগ ব্যবস্থাপনা, পাতাপোড়া বা পাতা ঝলসানো (বিএলবি) রোগ ব্যবস্থাপনা, ব্লাস্ট রোগ ব্যবস্থাপনা, টুংরো রোগ ব্যবস্থাপনা,উফরা রোগ ব্যবস্থাপনা,গোড়া পচা ও বাকানি রোগ ব্যবস্থাপনা, আগাছা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা,ধানের সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, বেগুনের পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা, কাঁঠালে পোকা,পাতার জ্যাসিড বা শ্যামা পোকা,জাব পোকা, বেগুনের প্রধান প্রধান রোগ ব্যবস্থাপনা,বেগুনের ফলপচা ও কান্ড পচা রোগ,বেগুনের উইল্ট, কুমড়া জাতীয় ফসলের পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা,ফলের মাছি পোকা;সবজির রেড পামকিন বিটল, জাব পোকা,কুমড়া জাতীয় ফসলের রোগ ব্যবস্থাপনা,সাদা গুড়া (ডাউনী মিলডিউ), সীম ফসলের প্রধান প্রধান পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা, সীমের ফল ছেদক পোকা, সীমের জাব পোকা, সীমের পাতা ছেদক পোকা, সীমের সবুজ লেদা পোকা, সীম ফসলের রোগ ব্যবস্থাপনা, এনথ্রাকনোজ, ফল চাষের গুরুত্ব ও পুষ্টিমান নিয়ে আলোচনা, ফল গাছের ফলন বৃদ্ধির উপায়, ফলের পোকামাকড় রোগবালাই ও পুষ্টির অভাবজনিত সমস্যার নমুনা সংগ্রহ, বাছাই ও সনাক্তকরণ, ফল গাছের সমস্যাবলীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ফল ও ফল গাছের বালাইয়ের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ফল ঝরে যাওয়ার কারণ ও প্রতিকার, গাছ ছাঁটাই ব্যবস্থাপনা, আম গাছে একান্তর ক্রমিক ফল ধারনের কারণ ও ব্যবস্থাপনা, ফল গাছের বৃদ্ধি হরমোনের প্রভাব ও এর প্রয়োগ পদ্ধতি, কলার জাত, চারা নির্বাচন ও সঠিকভাবে চারা রোপন কৌশল, কলা বাগানের সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, কলার অতিরিক্ত সাকার (চারা) ও ফুল অপসারণ, কলা গাছে খুঁটি দেয়া এবং কাঁদি ঢেকে দেয়া, ফল পরিপুষ্ট ও পরিপক্ক হওয়ার সঠিক সময় নির্ধারণ, নিরাপদ উপায়ে ফল সংগ্রহ ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, বাছাই, গ্রেডিং, প্যাকিং, পরিবহণ, পাকানো ও বাজারজাতকরণ, বালাইনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব , বালাইনাশকের ঝুঁকিমুক্ত ব্যবহার কৃষকদের প্রশিক্ষণে হাতে- কণমে মিক্ষা দেওয়া হয়।
এছাড়াও স্মার্ট ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষি চর্চার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানা বক্তারা। এছাড়া অনুষ্ঠানস্থলে স্টলে উন্নত জাতের ফসল ও কৃষিপণ্য প্রদর্শন করা হয়, যা কৃষকদের মধ্যে নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতি সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করে।
এসময় উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা মো: ইব্রাহীম হোসেন, সিংগাইর প্রেসক্লাব এর সাধারণ সম্পাদক দৈনিক ইনকিলাব প্রতিনিধি মো. রকিবুল হাসান বিশ্বাস ও যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক দৈনিক আমার দেশ প্রতিনিধি আব্দুল মোতালেব ও সিংগাইর উপজেলা প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক মোবারক হোসেন’ দৈনিক”প্রতিদিনের বাংলাদেশ” প্রতিনিধি মো.আতিকুল ইসলামসহ কৃষক, পার্টনার ফিল্ড স্কুলের কর্মকর্তা ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। পরিশেষে সভার সভাপতি উপজেলা নির্বাহি অফিসার খায়রুন্নাহার এর বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় উপজেলা কৃষি সম্প্রারণ অফিসার রিদওয়ানুল হক ও উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা কাজী শহিদুল ফেরদৌস দায়িত্ব পালন করেন।





















