মৌমাছি ও পরাগায়ন সংকট

কৃষি পরামর্শ
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

সমীরণ বিশ্বাস:পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য,কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার পেছনে যে ক্ষুদ্র প্রাণীটি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তার নাম মৌমাছি। ক্ষুদ্র এই প্রাণীটি শুধু মধু উৎপাদনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং পৃথিবীর অধিকাংশ ফুল, ফল, শাকসবজি ও বীজ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো মৌমাছির মাধ্যমে সংঘটিত পরাগায়ন।

মৌমাছি ও পরাগায়ন সংকট: খাদ্য নিরাপত্তার নীরব বিপদ ! বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্যশস্য কোনো না কোনোভাবে পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল। আর সেই পরাগায়নের বড় অংশ সম্পন্ন করে মৌমাছি। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মৌমাছির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, বন উজাড়, একফসলি কৃষি এবং পরিবেশ দূষণের কারণে মৌমাছির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। এই সংকট শুধু একটি প্রাণীর সংকট নয়; এটি ভবিষ্যৎ খাদ্যব্যবস্থা, কৃষি অর্থনীতি এবং মানব সভ্যতার জন্য এক নীরব বিপদের বার্তা।

মৌমাছি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ?

মৌমাছিকে বলা হয় প্রকৃতির “নীরব কৃষিশ্রমিক”। তারা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করার সময় এক ফুলের পরাগ অন্য ফুলে স্থানান্তর করে। এই প্রক্রিয়াই হলো পরাগায়ন। এর ফলে গাছে ফল ও বীজ সৃষ্টি হয়। আম, লিচু, তরমুজ, সরিষা, সূর্যমুখী, কফি, আপেল, বাদাম, টমেটোসহ অসংখ্য ফসল মৌমাছির পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল। যদি মৌমাছি না থাকে, তাহলে এসব ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাবে। একটি মৌচাক প্রতিদিন হাজার হাজার ফুলে যায় এবং প্রতিটি ফুলে বসে পরাগ ছড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, কৃষকের জমিতে মৌমাছি অদৃশ্য শ্রমিকের মতো কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে মৌমাছির পরাগায়নের কারণে ফসলের উৎপাদন ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

পরাগায়ন: কৃষির প্রাণশক্তি:

পরাগায়ন ছাড়া কৃষি কল্পনাই করা যায় না। উদ্ভিদের বংশবিস্তার ও ফলন বৃদ্ধির জন্য পরাগায়ন অপরিহার্য। প্রাকৃতিকভাবে বাতাস, পানি, পাখি, প্রজাপতি ও অন্যান্য পতঙ্গও পরাগায়নে ভূমিকা রাখে; তবে সবচেয়ে দক্ষ ও কার্যকর পরাগবাহক হলো মৌমাছি। বাংলাদেশের কৃষিতেও মৌমাছির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিশেষ করে সরিষা, ধনে, কালোজিরা, বিভিন্ন ফল ও সবজি চাষে মৌমাছির ভূমিকা বিশাল। গবেষণায় দেখা গেছে, সরিষা ক্ষেতে মৌচাক স্থাপন করলে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। একইসঙ্গে বীজের গুণগত মানও উন্নত হয়। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ২০ হাজারের বেশি প্রজাতির মৌমাছি রয়েছে। কিন্তু এদের একটি বড় অংশ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিস্থিতি কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ সংকেত বহন করছে।

কেন কমে যাচ্ছে মৌমাছি ?

অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার: আধুনিক কৃষিতে নির্বিচারে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার মৌমাছির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি। বিশেষ করে নিওনিকোটিনয়েড জাতীয় কীটনাশক মৌমাছির স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে তারা দিক হারিয়ে ফেলে, চাক খুঁজে পায় না এবং ধীরে ধীরে মারা যায়। অনেক কৃষক ফুল ফোটার সময়ও কীটনাশক স্প্রে করেন, যা সরাসরি মৌমাছির মৃত্যুর কারণ হয়। বিষাক্ত রাসায়নিক ফুলের মধু ও পরাগেও থেকে যায়, যা মৌমাছির জন্য প্রাণঘাতী। জলবায়ু পরিবর্তন: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঋতুচক্রের অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটছে। কখনো অতিরিক্ত গরম, কখনো খরা, আবার কখনো অতিবৃষ্টি মৌমাছির জীবনচক্রকে ব্যাহত করছে। ফুল ফোটার সময় ও মৌমাছির খাদ্য সংগ্রহের সময়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে। ফলে মৌমাছি পর্যাপ্ত খাদ্য পাচ্ছে না। একইসঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মৌচাক ধ্বংস করছে। বন উজাড় ও আবাসস্থল ধ্বংস: বনভূমি, ঝোপঝাড় ও বুনো ফুলের এলাকা কমে যাওয়ায় মৌমাছির প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। শহরায়ন ও শিল্পায়নের কারণে তারা নিরাপদ পরিবেশ হারাচ্ছে। আগে গ্রামবাংলার মাঠ, পুকুরপাড়, বন ও গাছপালায় মৌমাছির বিচরণ ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য। এখন সেই পরিবেশ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। একফসলি কৃষি ব্যবস্থা: একই জমিতে দীর্ঘসময় ধরে এক ধরনের ফসল চাষ করলে জীববৈচিত্র্য কমে যায়। এতে মৌমাছির খাদ্যের বৈচিত্র্যও নষ্ট হয়। মৌমাছি বিভিন্ন ধরনের ফুল থেকে খাদ্য সংগ্রহ করতে পছন্দ করে। কিন্তু একফসলি কৃষিতে তারা পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না। দূষণ ও রোগবালাই: বায়ু দূষণ, ভারী ধাতু এবং বিভিন্ন রোগ ও পরজীবী মৌমাছির জন্য বড় হুমকি। “ভ্যারোয়া মাইট” নামক পরজীবী মৌমাছির কলোনি ধ্বংস করে দিচ্ছে। এছাড়া দূষিত পরিবেশে মৌমাছির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়।

মৌমাছি হারালে কী হবে ?

মৌমাছির সংখ্যা যদি ক্রমাগত কমতেই থাকে, তাহলে এর প্রভাব পড়বে পুরো পৃথিবীর খাদ্যব্যবস্থার ওপর। খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে:  ফল, সবজি ও তেলবীজ জাতীয় ফসলের উৎপাদন ভয়াবহভাবে কমে যাবে। খাদ্যের বৈচিত্র্যও হ্রাস পাবে। খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে:  উৎপাদন কমে গেলে বাজারে খাদ্যের সংকট তৈরি হবে। ফলে ফলমূল ও পুষ্টিকর খাদ্যের দাম বেড়ে যাবে, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। পুষ্টিহীনতা বাড়বে: মৌমাছি নির্ভর ফসলের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন, খনিজ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার। এসব খাদ্য কমে গেলে অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে: মৌমাছি শুধু কৃষির জন্য নয়, প্রাকৃতিক বন ও বন্য উদ্ভিদের জীবনচক্রের সঙ্গেও জড়িত। পরাগায়ন না হলে অনেক উদ্ভিদ বিলুপ্ত হতে পারে, যা পুরো বাস্তুতন্ত্রকে বিপন্ন করবে।

বাংলাদেশে মৌমাছি ও পরাগায়নের বাস্তবতা:

বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ হওয়ায় এখানে মৌমাছির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশের দক্ষিণাঞ্চল, সরিষা ক্ষেত, লিচু বাগান ও সুন্দরবন এলাকায় মৌচাষের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে মৌমাছির সংখ্যা কমছে। গ্রামের অনেক কৃষক এখনো মৌমাছির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। তারা মনে করেন মৌমাছি শুধু মধু দেয়। অথচ বাস্তবে মৌমাছি ফসল উৎপাদনের অন্যতম প্রধান সহযোগী। বাংলাদেশে মৌচাষকে কৃষির সঙ্গে সমন্বিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে কৃষকের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি ফসল উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংকট মোকাবিলায় করণীয়:

কীটনাশকের ব্যবহার কমানো: বিষাক্ত রাসায়নিকের পরিবর্তে জৈব বা পরিবেশবান্ধব বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। ফুল ফোটার সময় কীটনাশক স্প্রে বন্ধ করতে হবে। মৌমাছিবান্ধব কৃষি গড়ে তোলা: জমির পাশে ফুলগাছ, বনজ গাছ ও বুনো উদ্ভিদ সংরক্ষণ করতে হবে। কৃষিজমিতে জীববৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। মৌচাষে উৎসাহ দেওয়া:  গ্রামীণ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে মৌচাষ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এটি কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎসও হতে পারে। সচেতনতা বৃদ্ধি: স্কুল, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে মৌমাছির গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। গবেষণা ও নীতিগত সহায়তা: সরকার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে মৌমাছি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। পরিবেশবান্ধব কৃষিনীতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।

মৌমাছি শুধু একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গ নয়; এটি পৃথিবীর খাদ্যব্যবস্থা, কৃষি অর্থনীতি এবং জীববৈচিত্র্যের অন্যতম ভিত্তি। মৌমাছির ডানার ক্ষুদ্র কম্পনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ। তাই মৌমাছির সংকট মানে শুধু একটি প্রাণীর সংকট নয়, এটি মানব সভ্যতার অস্তিত্বের সংকট। আজ যদি আমরা মৌমাছিকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আগামী প্রজন্মকে খাদ্য সংকট, পুষ্টিহীনতা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। তাই সময় থাকতে আমাদের সচেতন হতে হবে। কৃষি, প্রকৃতি ও মানুষের টিকে থাকার স্বার্থেই মৌমাছি ও পরাগায়ন ব্যবস্থাকে রক্ষা করা এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।

লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।