সমীরণ বিশ্বাস:বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে রাসায়নিক সারের অবদান অনস্বীকার্য। সবুজ বিপ্লবের পর থেকে সার ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় কম বা বেশি সার প্রয়োগ, উভয়ই কৃষির জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে অসম মাত্রায় সার ব্যবহার বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা ইউরিয়া বা নাইট্রোজেন সার বেশি ব্যবহার করলেও ফসফরাস, পটাশ, সালফার, জিংক ও বোরনের মতো অন্যান্য পুষ্টি উপাদান পর্যাপ্ত মাত্রায় প্রয়োগ করেন না। ফলে মাটির পুষ্টি ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সুষম সার ব্যবহারের গুরুত্ব: ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য কমপক্ষে ১৭টি অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন। এর মধ্যে নাইট্রোজেন (N), ফসফরাস (P) ও পটাশিয়াম (K) প্রধান পুষ্টি উপাদান হিসেবে পরিচিত। এছাড়া সালফার, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, বোরন, আয়রনসহ বিভিন্ন অণুপুষ্টি উপাদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে উপস্থিত থাকলেই সর্বোচ্চ উৎপাদন পাওয়া সম্ভব। একটি উপাদান অতিরিক্ত বা ঘাটতিতে থাকলে উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। কৃষিবিজ্ঞানে এটিকে "লিবিগের ন্যূনতম সূত্র" (Law of Minimum) বলা হয়। অর্থাৎ যে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, সেই উপাদানই উৎপাদনের সীমা নির্ধারণ করে।
মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস: অসম মাত্রায় সার ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় মাটির ওপর। দীর্ঘদিন ধরে একমুখীভাবে ইউরিয়া সার প্রয়োগের ফলে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে যায় এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি তৈরি হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ইতোমধ্যেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রার নিচে নেমে গেছে। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন প্রয়োগ মাটির অম্লতা বৃদ্ধি করে, ফলে মাটির গঠন ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যায় এবং মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের অবনতি ঘটে। একসময় যে জমি থেকে উচ্চ ফলন পাওয়া যেত, ধীরে ধীরে সেই জমির উৎপাদন ক্ষমতা কমতে শুরু করে। ফলে একই পরিমাণ ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষককে আরও বেশি সার ব্যবহার করতে হয়, যা একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে।
ফসলের ফলন ও গুণগত মান কমে যায়: অনেক কৃষকের ধারণা, বেশি সার মানেই বেশি ফলন। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। প্রয়োজনের অতিরিক্ত নাইট্রোজেন প্রয়োগ করলে গাছের কাণ্ড ও পাতা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেলেও শস্য উৎপাদন কমে যেতে পারে। ধানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগে গাছ হেলে পড়ার প্রবণতা বাড়ে। সবজি ফসলে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন প্রয়োগে ফলের পরিবর্তে পাতার বৃদ্ধি বেশি হয়। আবার পটাশ বা জিংকের ঘাটতিতে ফলের আকার ছোট হয় এবং গুণগত মান কমে যায়। অসম পুষ্টি ব্যবস্থাপনার কারণে ফসলে ফুল ও ফল ধারণ কমে, শস্য পূর্ণতা পায় না এবং বাজারমূল্যও কমে যায়। ফলে কৃষক কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হন।
রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বৃদ্ধি: সুষম পুষ্টি গ্রহণকারী উদ্ভিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে। কিন্তু অসম মাত্রায় সার ব্যবহারে উদ্ভিদ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রোগ-পোকার আক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অতিরিক্ত নাইট্রোজেনের কারণে গাছের কোমল টিস্যু বৃদ্ধি পায়, যা বিভিন্ন পোকামাকড়ের জন্য আকর্ষণীয় খাদ্যে পরিণত হয়। ধান, গম, ভুট্টা ও সবজি ফসলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। ফলস্বরূপ কৃষককে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়, যা উৎপাদন খরচ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
পরিবেশ দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি : অসম মাত্রায় সার ব্যবহার শুধু কৃষিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব বিস্তৃত হয় সমগ্র পরিবেশে। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফরাস বৃষ্টির পানির সঙ্গে ধুয়ে খাল, বিল, নদী ও জলাশয়ে পৌঁছে যায়। এতে জলজ পরিবেশে শৈবালের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে, যাকে ইউট্রোফিকেশন বলা হয়। ফলে পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি সৃষ্টি হয় এবং মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। এছাড়া মাটিতে বসবাসকারী উপকারী অনুজীব, কেঁচো এবং অন্যান্য জীবের সংখ্যা কমে যায়। এসব অনুজীব মাটির উর্বরতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের ক্ষতি হলে মাটির প্রাকৃতিক পুনর্জীবন ক্ষমতাও হ্রাস পায়। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন থেকে নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়, যা একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। এটি জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করে।
খাদ্যে সার অবশেষ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি: অতিরিক্ত ও অসম সার ব্যবহারের আরেকটি গুরুতর প্রভাব হলো খাদ্যে ক্ষতিকর অবশেষ বা রেসিডিউয়ের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়া। বিশেষ করে শাকসবজিতে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন প্রয়োগের ফলে নাইট্রেট জমা হতে পারে। মানবদেহে এই নাইট্রেট নাইট্রাইটে রূপান্তরিত হয়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে দূষিত খাদ্য গ্রহণের ফলে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং বয়স্কদের স্বাস্থ্য বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানিতে নাইট্রেট দূষণ বৃদ্ধি পেলে নিরাপদ পানীয় জলের সংকটও দেখা দিতে পারে। সুতরাং সার ব্যবহারের বিষয়টি শুধু কৃষি উৎপাদনের নয়; এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কৃষকের আর্থিক ক্ষতি: সারের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় কৃষক মনে করেন বেশি সার দিলে ফলনও বেশি হবে। কিন্তু বাস্তবে অতিরিক্ত সার প্রয়োগে উৎপাদন বৃদ্ধি না পেয়ে বরং ফলন কমে যেতে পারে। ফলে কৃষক অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেও প্রত্যাশিত লাভ পান না। অন্যদিকে রোগ-পোকা বৃদ্ধি পাওয়ায় কীটনাশক ব্যবহারের খরচও বেড়ে যায়। এতে কৃষকের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং লাভজনকতা কমে যায়।
পুষ্টি উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক: উদ্ভিদের পুষ্টি ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক। কোনো একটি পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলে অন্য উপাদান পর্যাপ্ত থাকলেও ফসল তা সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, পর্যাপ্ত ফসফরাস না থাকলে নাইট্রোজেনের কার্যকারিতা কমে যায়। আবার পটাশের ঘাটতিতে উদ্ভিদের পানি ব্যবস্থাপনা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ শুধু একটি উপাদান বেশি প্রয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব নয়। প্রতিটি উপাদানকে সুষম ও বৈজ্ঞানিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
টেকসই কৃষির জন্য করণীয়: অসম মাত্রায় সার ব্যবহারের সমস্যা মোকাবিলায় কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি, নিয়মিত মাটি পরীক্ষা: মাটির প্রকৃত পুষ্টি অবস্থা জানার জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর মাটি পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সার সুপারিশ অনুসরণ করা উচিত। সুষম সার ব্যবস্থাপনা: শুধু ইউরিয়া নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক ও বোরনসহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি: গোবর, কম্পোস্ট, ভার্মি কম্পোস্ট, সবুজ সার ও ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে ফিরিয়ে দিয়ে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা: রাসায়নিক ও জৈব সারের সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য বজায় থাকে। কৃষক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা: কৃষকদের আধুনিক পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, মাটি পরীক্ষা ও সার প্রয়োগ প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার: সয়েল সেন্সর, ডিজিটাল মাটি মানচিত্র, জিপিএসভিত্তিক সার ব্যবস্থাপনা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু অধিক সার ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে না; বরং সঠিক মাত্রায় ও সুষমভাবে সার ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। অসম মাত্রায় সার প্রয়োগ মাটির উর্বরতা নষ্ট করে, ফলন ও গুণগত মান কমায়, রোগ-পোকার আক্রমণ বাড়ায়, পরিবেশ দূষণ ঘটায়, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে এবং কৃষকের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়। তাই সময়ের দাবি হলো “বেশি সার নয়, সঠিক সার”। মাটি পরীক্ষা, সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, জৈব পদার্থ বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে কৃষি হবে অধিক উৎপাদনশীল, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই। সুস্থ মাটি, নিরাপদ খাদ্য এবং লাভজনক কৃষির জন্য সুষম সার ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। অসম মাত্রায় সার ব্যবহার: কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব বিপদ।
লেখক: সমীরণ বিশ্বাস, কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।





















