মোঃ রাসেল উদ্দীন: স্বল্প আয়ের মানুষের ভিটামিন ও পুষ্টির ঘাটতি পূরণে ন্যায্যমূল্যে ছোট পরিমাপের প্যাকেটজাত ভোজ্যতেল বাজারে সহজলভ্য করার দাবি জানিয়েছেন ভোক্তা অধিকারকর্মী, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, খোলা ভোজ্যতেল ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তাই নিরাপদ, মানসম্মত ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন ভোজ্যতেল সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে দিতে ছোট পরিমাপের প্যাকেজিং চালু করা সময়ের দাবি।
আজ বুধবার (২২ জুলাই) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ সম্মেলনকক্ষে ‘স্বল্প আয়ের ভোক্তার ভিটামিন ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে স্বল্পমূল্যের ছোট পরিমাপের প্যাকেজিং: জনমত সৃষ্টি সংক্রান্ত আলোচনা সভা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), চট্টগ্রাম বিভাগ ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন ক্যাব কেন্দ্রিয় কমিটির সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন। মূখ্য আলোচক ছিলেন সাবেক সচিব ও ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জমান, চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), ডাঃ সেখ ফজলে রাব্বি, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রট সৈয়দ মাহমুদুল হক, নিরাপদ খাদ্য কতৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের পরামর্শক মুশতাক মোঃ ইফতেখার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অফিসার ডাঃ আলিভা হক। আলোচনায় অংশনেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ডঃ আমির মুহাম্মদ নসরুল্যাহ, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারী ও অ্যানিমেল বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রযুক্তি ও পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ডঃ আশেয়া বেগম, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সঞ্চয় বিশ্বাস, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপ-পরিচালক ফয়েজউল্যাহ, পুষ্টিবিদ হাসিনা আকতার লিপি, বিএসটিআই এর সহকারী পরিচালক মনতোষ বিশ্বাস, জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির কেন্দ্রিয় কমিটির সহ-সভাপতি হাজী ছালামত আলী, বাংলাদেশ রেস্তোরা মালিক কল্যা্ন সমিতির সভাপতি ইলিয়াছ ভুইয়া, বনফুল কিশোয়ান গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক আনামুল আলম, বাংলাদেশ রেলওয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক শেখ ফরিদ, প্রবীন সাংবাদিক এম নাসিরুল হক, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জেসমিনা খানম, ক্যাব মহানগরের সাংগঠনিক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস, যুগ্ন সম্পাদক মোঃ সেলিম জাহাঙ্গীর, রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী মিটুল দাশ গুপ্ত, যুব ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আবু হানিফ নোমান প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। তবে টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। তিনি নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মুখ্য আলোচক ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাবেক সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জমান বলেন, খোলা ভোজ্যতেল ব্যবহারের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে ন্যায্যমূল্যে ছোট পরিমাপের প্যাকেটজাত ভোজ্যতেল উৎপাদন ও বাজারজাত নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষও নিরাপদ ও পুষ্টিমানসম্পন্ন ভোজ্যতেল ব্যবহারের সুযোগ পান। তিনি আরও বলেন, হার্ট ফাউন্ডেশন ও ক্যাব যৌথভাবে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে কাজ করবে এবং কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা অযৌক্তিক চাপের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সরকারের উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করবে।
সভায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক হারে ভিটামিন 'এ' ও 'ডি' ঘাটতি বিদ্যমান থাকলেও, খোলা ভোজ্যতেলের পরিবর্তে সাশ্রয়ী ছোট প্যাকেজিং চালু না হওয়ায় এই জনগোষ্ঠী ফর্টিফিকেশনের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ২০১৩ সালে ভিটামিন 'এ' ফর্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করার পরও দরিদ্র জনগোষ্ঠী খোলা তেল ক্রয় করতে বাধ্য হওয়ায় ফর্টিফিকেশনের সুফল তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ইম্প্রুভড নিউট্রিশন (GAIN) ২০২১ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় সর্বোত্তম প্যাকেজিং হিসেবে PET বোতল/জার চিহ্নিত হলেও তা স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ব্যয়বহুল বলে উল্লেখ করা হয়। গবেষণায় খোলা তেলের গ্রাহকের আচরণ ও সামর্থ্য বিবেচনায় ছোট পরিমাপের প্যাকেজিং চালুর সুপারিশ করা হয়। এরপর ২০২২ সালের ২ জুন শিল্প মন্ত্রণালয় ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ থেকে শতভাগ ফুডগ্রেড প্যাকেজিং বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনা দিলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
বক্তারা আরও জানান, ২০১৯ সালেও ৬-১৪ বছরের শিশুদের মধ্যে ভিটামিন 'এ' ঘাটতি ৫১% এবং গর্ভবতী নন এমন মহিলাদের মধ্যে ৮% রয়েছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, ভিটামিন 'ডি' ঘাটতির পরিস্থিতি গড়ে ৬৭%, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ৭৭.৮% এবং গর্ভবতী নারীদের মধ্যে ৮৩.৩%। খোলা তেলে ভিটামিন 'এ' অত্যন্ত আলোক সংবেদনশীল হওয়ায় দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, ফলে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ সত্ত্বেও দরিদ্র জনগণের মধ্যে ভিটামিন ঘাটতি কমছে না।
সভায় তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরা হয়। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ৩১ জন অংশগ্রহণকারী পাউচ, মিনি প্যাক ও স্যাশে (৫০-৫০০ মিলি) প্রস্তাব করেছেন, যার যুক্তি অল্প টাকায় কেনা সম্ভব এবং দ্রুত ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় বাসায় ভিটামিন হ্রাসের সম্ভাবনা কম। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬ জন অংশগ্রহণকারী পাউচ (৫০-৫০০ মিলি) সুপারিশ করেছেন, যা গাদ, ধুলোবালি ও পোকামাকড়ের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি কমায়। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮ জন অংশগ্রহণকারী পাউচ ও স্যাশে প্রস্তাব করেছেন, যেখানে 'রিটার্ন-এন্ড-সেভ' বা 'ক্যাশ ব্যাক' প্রচলনযোগ্য। বিশেষজ্ঞরা "ক্যাফেটেরিয়া অ্যাপ্রোচ" সমর্থন করেছেন, অর্থাৎ সকল পরিমাপের ও উপযুক্ত সব প্লাস্টিক প্যাকেজিং থাকতে পারে।
ব্যবসায়ীরা স্টেকিং, হ্যান্ডলিং, প্যাকেট ছিদ্র হওয়ার আশঙ্কা ও ভোক্তার চাহিদার অভাব উল্লেখ করলেও, বিশেষজ্ঞরা এর সমাধান দিয়েছেন। পুনঃব্যবহারের অসুবিধার জন্য জিপ লক পাউচ বা স্ট্যান্ডিং পাউচ প্রচলন, লিকেজ ও ছিঁড়ে যাওয়ার জন্য সঠিক সিলিং, ৫-স্তর বিশিষ্ট প্যাকেট ও উপযুক্ত কোটিং, এবং পরিবেশ দূষণ রোধে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও 'রিটার্ন-এন্ড-সেভ' বা 'ক্যাশ ব্যাক' প্রচলনের কথা বলা হয়।
বক্তারা জানান, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস (BDS) ভোজ্যতেল পাম ওলিন (BDS 1774:2006) ও সয়াবিন তেল (BDS 1769:2014)-এ ফুডগ্রেড পাত্র/বোতল ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। ভোজ্যতেলে ভিটামিন 'এ' সমৃদ্ধকরণ বিধিমালা, ২০১৫-এ পাত্র বা প্যাকেট আর্দ্রতারোধক ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় এমন উপকরণ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। খাদ্য স্পর্শক প্রবিধানমালা, ২০১৯-এ Codex Alimentarius Commission (CAC), USFDA বা EFSA-এর স্বীকৃত মান অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ Nutrition for Growth (N4G) ২০২৫ প্যারিস সম্মেলনে ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০% বাল্ক অয়েল ফেজ-আউটের অঙ্গীকার করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সকল শ্রেণীর ভোক্তার কথা মাথায় রেখে সাশ্রয়ী মূল্যে অস্বচ্ছ (আলো-প্রতিরোধী) ফুডগ্রেড প্যাকেজিং-এ ভোজ্যতেল বাজারজাত করতে হবে।
সভায় প্যাকেজিং শিল্প, ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, প্যাকার্স ও রি-প্যাকার্স, পুষ্টিবিদ, সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নীতিনির্ধারক, সিভিল সোসাইটি ও গণমাধ্যমের জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও করণীয় নির্ধারণ করা হয়। বিশেষ করে কর রেয়াত, শুল্ক হ্রাস ও লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির মাধ্যমে স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ পণ্য সহজলভ্য করার আহ্বান জানানো হয়।



