
মুহাম্মদ রিয়াজ, এগ্রিলাইফ :দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল হলেও ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার গ্রামীণ অর্থনীতি অনেকটাই মাছ চাষের উপর নির্ভরশীল । তবে এ অঞ্চলের অধিকাংশ খামারিদের মাছ চাষের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে এখনও পর্যাপ্ত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে । এই সীমাবদ্ধতা দূর করে দেশের মৎস্য খাতকে আরও সমৃদ্ধ করতে এক দিনের বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছে নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড। কর্মশালায় সার্বিক সহযোগিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ইউএস গ্রেইনস অ্যান্ড বায়োপ্রোডাক্টস কাউন্সিল (USGBC)।
আজ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১০টায় ফুলবাড়িয়ার নোঙ্গর কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রায় ৭০ জন মৎস্যচাষি, ফিড ডিলার ও সংশ্লিষ্টরা অংশগ্রহণ করেন। “গুণগত খাদ্য–পরিমিত পরিমাণ, মাছের বৃদ্ধি–চাষির লাভ” প্রতিপাদ্যে আয়োজিত প্রশিক্ষণটি দুটি প্রাণবন্ত সেশনে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সেশনে মাছের বৈজ্ঞানিক চাষপদ্ধতি বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা এবং দ্বিতীয় সেশনে হাতে-কলমে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. মহিউদ্দিন আমিরুল কবির চৌধুরী, পুষ্টি ও ফিড বিশেষজ্ঞ অং থোয়েন এ (অন্তু) এবং নারিশের জুনিয়র এজিএম ওবাইদুল ইসলাম।
এই কর্মশালায় আধুনিক পুকুর ব্যবস্থাপনা, সঠিক মাত্রায় খাদ্য প্রয়োগ, রোগ কারণ ও প্রতিরোধের কৌশল, পুকুরের অ্যামোনিয়া ও পানির পিএইচ নিয়ন্ত্রণ, প্রোবায়োটিকের ব্যবহার, পোনা নির্বাচন ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের মূল্যায়নে কুইজ অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে ব্যবহারিক প্রদর্শনী করা হয়।
অনুষ্ঠানে নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেডের সিনিয়র সিএসও ড. জাহিদুল ইসলাম সাদ্দামের সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন ইউএস গ্রেইনস অ্যান্ড বায়োপ্রোডাক্টস-এর গ্লোবাল স্ট্যাটিস্টিকস অ্যান্ড ট্রেড ম্যানেজার মার্ক সিভিয়ার, নারিশের এভিপি (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) মো. সামিউল আলিম, জিএম এস. এম. এ. হক, সিনিয়র ডিজিএম ডা মুহাম্মদ মুছা কালিমুল্লাহ, ইউএস গ্রেইনস অ্যান্ড বায়োপ্রোডাক্টসের কনসালটেন্ট মাহি আলম সারোয়ার, পুষ্টি ও ফিড বিশেষজ্ঞ অং থোয়েন এ (অন্তু) ও জুনিয়র এজিএম ওবাইদুল ইসলামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এবং প্রায় ৭০ জন খামারি।
গ্লোবাল স্ট্যাটিস্টিকস অ্যান্ড ট্রেড ম্যানেজার মার্ক সিভিয়ার বলেন,“যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি–ভিত্তিক আমাদের প্রতিষ্ঠানটি কৃষক ও খামারিদের সমন্বয়ে গঠিত। ৯টি অফিসের মাধ্যমে ৭০টি দেশে কাজ করছি। বাংলাদেশের গ্রামীণ মৎস্যচাষিদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত করতে পারলে কম খরচে বেশি মাছ উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে দেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি অ্যাকুয়াকালচার সেক্টর আরও উন্নত হবে।”
ফুলবাড়িয়ার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সরকার মৎস্য চাষীদের মাছ চাষে উৎসাহিত করতে নানা পুরস্কার ও প্রণোদনা দিয়ে থাকে। মাছ চাষে যদি আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করা যায় তাহলে আরও লাভবান হওয়া সম্ভব। আমরা সর্বদা চাষীদের নতুন নতুন প্রযুক্তি গ্রহন করতেও উৎসাহিত করে থাকি। গুণগত দিক থেকে নারিশ ফিড অত্যন্ত ভালো। আমি নিজেও পরীক্ষা করেছি। চাষি বাঁচলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব।”
এভিপি সামিউল আলিম বলেন, “নিরাপদ খাদ্যের মাধ্যমে নিরাপদ পণ্য উৎপাদনই আমাদের লক্ষ্য। কারণ দেশের মানুষ সুস্থ থাকলেই একটি সুস্থ জাতি গড়ে উঠবে। এই ক্ষেত্রে নারিশ সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে অ্যান্টিবায়োটিক ও কেমিক্যালমুক্ত ফিড প্রস্তুত করে। ISO ও HACCP স্বীকৃত আমাদের ফিডে অতিরিক্ত ভিটামিন বা মিনারেল ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। চাষিরা নিশ্চিন্তে এটি ব্যবহার করতে পারবেন।”
জিএম এস. এম. এ. হক বলেন, “মাছ চাষে লাভবান হওয়ার মূল চাবিকাঠি সঠিক পোনা নির্বাচন ও মানসম্মত খাদ্য ব্যবহার। এটি সম্পূর্ণ খামারিদের হাতে। পুকুরে মাছের অতিরিক্ত ঘনত্ব কমানোর পাশাপাশি অক্সিজেন, অ্যামোনিয়া এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম জানা অত্যন্ত প্রয়োজন। পুুকুরে মাছের ঘনত্ব বাড়ালে এরোটর ব্যবহার করতে হবে এবং মানসম্মত খাদ্য ব্যবহার করতে হবে। নারিশ ফিড ব্যবহারে পানির রঙের পরিবর্তন হয় না এবং মাছ সতেজ থাকে। ফলে লাভও বেশি হয়।”
মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. মহিউদ্দিন আমিরুল কবির চৌধুরী বলেন,“ পুকুরে নিম্নমানের খাদ্য ব্যবহারে পানির গুণগত মান নষ্ট হয় এবং অণুজীব বৃদ্ধি পায়। এসব অণুজীবের নিঃসৃত টক্সিন মাছকে স্ট্রেসে ফেলে, ফলে রোগবালাই বাড়ে এবং উৎপাদন কমে যায়। লাভবান হতে হলে সতেজ পোনা, মানসম্মত খাদ্য এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার অপরিহার্য।”

পুষ্টি ও ফিড বিশেষজ্ঞ অং থোয়েন এ (অন্তু) বলেন, “ফিডের মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো খাদ্য তৈরির মৌলিক উপাদানের সংকট ও মূল্য বেড়ে যাওয়া । ভালো ফিডের দাম কিছুটা বেশি হলেও এর ফিড কনভার্সন রেশিও (FCR) ভালো হওয়ায় উৎপাদন বেশি হয়। নিম্ন মানের খাবারের এফসিআর কম হয়। ফলে বেশি খাদ্য দিয়ে মাছ উৎপাদন করতে হয়। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খামারিদের লোকসানও গুণতে হয়। এছাড়া পুকুরে কোন মেডিসিন প্রয়োগ করার পূর্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ পুকুরে ভবিষ্যত মেডিসিনের ক্ষতিকর প্রভাব ভয়ংঙ্কর। ”
ডা মুহাম্মদ মুছা কালিমুল্লাহ বলেন, শুধু লাভের চিন্তা করলেই হবে না। আমাদের নিরাপদ খাদ্য তৈরী দিকেও নজর দিতে হবে। এই জন্য মাছের উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত নিরাপদ হতে।
জুনিয়র এজিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “পানির তাপমাত্রা আদর্শ না হলে মাছ খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দেয়। এতে অপচয় বাড়ে এবং উৎপাদন কমে যায়। ভালো ফিডে প্রোটিন ও পুষ্টিমান বেশি থাকে এবং সহজপাচ্য হওয়ায় মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এসব ক্ষেত্রে নারিশ ফিড শ্রেষ্ঠ।” তিনি আরও বলেন, পুকুরের মাছে রোগের সংক্রামণ দেখা দেওয়া মাত্রই মাছের খাবার বন্ধ করতে হবে এবং পানি পরিবর্তন করতে হবে। পরবর্তী রোগের ধরন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক ব্যবহার করতে হবে।
মৎস্য খামারি মো. আসাদ বলেন, “আজকের প্রশিক্ষণটি অত্যন্ত চমৎকার ছিল। খাদ্য ব্যবস্থাপনা, পিএইচ নিয়ন্ত্রণ, অ্যামোনিয়া ব্যবস্থাপনা, পোনা ব্যবস্থাপনা ও এয়ারেটর ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক দিক সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি। এগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করলে নিশ্চয়ই লাভবান হব। অতিরিক্ত ভিটামিন বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে মাছের ক্ষতি হয় এবং উৎপাদন খরচও বাড়ে।”
উল্লেখ্য এর আগে আরও ৪টি প্রশিক্ষণ কর্মশালা ময়মনসিংহের নেত্রকোণা, ফুলপুর, মুক্তাগাছা ও শম্ভুগঞ্জে আয়োজন করা হয়।
























