
এগ্রিলাইফ প্রতিবেদক: এল নিনো (El Niño), পরিবেশ, মৎস্য সেক্টর, অ্যাকুয়া নিউট্রিশন এবং কৃষি অর্থনীতির জন্য এক বড় ধরনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবারও সামনে আসছে। পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে সম্ভাব্য একটি “বর্ধিত” বা শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বব্যাপী জলবায়ু ও খাদ্য ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে, যার প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমনটাই জানিয়েছেন পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির।
পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির বলেন, এল নিনো হলো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহের পরিবর্তনের একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। এটি সাধারণত ২ থেকে ৭ বছর অন্তর ঘটে এবং বিশ্বব্যাপী খরা, বন্যা, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে সুপার এল নিনোর ক্ষেত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে গিয়ে শক্তিশালী বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-টার্ম ওয়েদার ফোরকাস্ট (ECMWF) পূর্বাভাস দিয়েছে যে ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম বা শরতে একটি শক্তিশালী এল নিনো গঠনের উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে। একইসঙ্গে CCSR/IRI ENSO প্লুম পূর্বাভাস অনুযায়ী এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে এল নিনো গঠনের সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশ এবং বছরের বাকি সময়জুড়ে এর আধিপত্য থাকার সম্ভাবনা ৮৮-৯৪ শতাংশ। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করার ঝুঁকি রয়েছে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির।
এই জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নধর্মী প্রভাব পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আফ্রিকা ও ভারতের কিছু অংশে তাপমাত্রা বাড়তে পারে, অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে খরা ও তাপপ্রবাহ তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। উত্তর আমেরিকায় গ্রীষ্মকাল স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উষ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে ব্যাপক বৈচিত্র্য দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
মৎস্য খাতে এল নিনোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির সতর্ক করে বলেন, সমুদ্র ও পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাছের খাদ্য উপাদান কমে যায়, মাছের স্বাভাবিক আবাসস্থল পরিবর্তিত হয় এবং উৎপাদন কমে যায়। পাশাপাশি অ্যাকুয়াকালচার খামারগুলোও ক্ষতির মুখে পড়ে এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিকভাবে মৎস্য খাতের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এল নিনো একটি বড় ঝুঁকির কারণ। এই সময় মৌসুমি বায়ুর কার্যকারিতা কমে গিয়ে বৃষ্টিপাত হ্রাস পায়, ফলে খরা ও পানি সংকট দেখা দেয়। তীব্র তাপপ্রবাহ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, কৃষিতে ফলন হ্রাস, খাদ্য সংকট এবং শুষ্ক আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সম্ভাব্য সুপার এল নিনো ২০২৬ সালে শুরু হয়ে ২০২৭ সালে এর প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। অতীতের ২০১৫ সালের শক্তিশালী এল নিনোর তুলনায় এবার আরও বেশি তীব্রতা দেখা দিতে পারে, যেখানে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে তাপমাত্রা ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছিল।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খরার ঝুঁকি বাড়বে এবং বর্ষা মৌসুম দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ফলে কৃষি, পশুপালন ও মৎস্য খাতে উৎপাদন হ্রাস পেয়ে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে বলে পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির তাঁর উদ্বেগের কথা জানান ।
পরিশেষে পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির উল্লেখ করেন, এল নিনো একটি পুনরাবৃত্ত প্রাকৃতিক চক্র হলেও এর প্রভাব মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত গবেষণা, নীতিনির্ধারণ এবং অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় অতিরিক্ত তাপমাত্রা, খরা, পানির সংকট এবং খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মানবজীবনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
























