সমীরণ বিশ্বাস:বাংলাদেশের কৃষি শুধু অর্থনীতির একটি খাত নয়; এটি মানুষের জীবন, খাদ্যনিরাপত্তা, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেশের কৃষিকে এক নীরব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘ খরা, আকস্মিক বন্যা ও বদলে যাওয়া ঋতুচক্র কৃষকের স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে অস্থির করে তুলছে। যে কৃষক একসময় প্রকৃতির ছন্দ বুঝে ফসল ফলাতেন, এখন তিনি আবহাওয়ার অনিশ্চয়তায় প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। একসময় বাংলাদেশের ছয় ঋতুর একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কৃষক জানতেন কখন বৃষ্টি হবে, কখন শীত নামবে কিংবা কখন খরার আশঙ্কা তৈরি হবে। কিন্তু এখন ঋতুচক্রের সেই স্বাভাবিকতা আর নেই। কখনো অসময়ে অতিবৃষ্টি, কখনো দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়া, আবার কখনো অস্বাভাবিক তাপদাহ কৃষির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন, মাটির স্বাস্থ্য, পানির প্রাপ্যতা এবং কৃষকের আয়, সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বদলে যাওয়া ঋতুচক্রে কৃষকের দুশ্চিন্তা ও জলবায়ু সহনশীল স্মার্ট কৃষির প্রয়োজন।
বর্তমানে কৃষকের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো অতিরিক্ত তাপমাত্রা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে গড় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তীব্র গরমে ধান, গম, ভুট্টা ও সবজির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ধানের ফুল আসার সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রা পরাগায়নে সমস্যা সৃষ্টি করে, ফলে ধানের শীষে চাল কম হয়। অনেক ক্ষেত্রে ফল ও সবজির আকার ছোট হয়ে যাচ্ছে, উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিও তাপচাপের কারণে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে কৃষকের ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু লাভ কমছে।
অন্যদিকে অনিয়মিত বৃষ্টি কৃষিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। আগে কৃষক নির্দিষ্ট সময়ে জমি প্রস্তুত করে বীজ বপন করতেন। এখন বৃষ্টি কখন হবে, কতটুকু হবে, তা অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কখনো অতিবৃষ্টিতে ফসলের জমি তলিয়ে যাচ্ছে, আবার কখনো দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়ায় সেচের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য নতুন সংকট সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খরার প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়ায় মাটির আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে এবং ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কৃষক পর্যাপ্ত সেচের অভাবে সময়মতো চাষ করতে পারছেন না। খরার কারণে জমির জৈবগুণ নষ্ট হচ্ছে, মাটির অণুজীব কমে যাচ্ছে এবং উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আবার বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক বন্যা কৃষকের আরেক বড় দুঃস্বপ্ন। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যায় পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায় নিয়মিত হয়ে গেছে। কয়েক মাসের পরিশ্রম মুহূর্তেই পানিতে ভেসে যায়। নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতাও কৃষিজমি কমিয়ে দিচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ধান, শাকসবজি ও ফল চাষে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে কৃষকের ফসলের বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে এবং বিকল্প জীবিকার সন্ধানে অনেকেই কৃষি থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু ফসল উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি কৃষকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত ফলন না পাওয়ায় কৃষকের ঋণের বোঝা বাড়ছে। অনেক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়ে জমি বিক্রি করছেন কিংবা শহরমুখী হচ্ছেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা দুটিই ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
এ অবস্থায় জলবায়ু সহনশীল স্মার্ট কৃষির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। স্মার্ট কৃষি বলতে এমন কৃষি ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব কৌশল ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো হয় এবং জলবায়ু ঝুঁকি কমানো হয়। বর্তমান বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের কৃষিকে অবশ্যই জলবায়ু সহনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে।
স্মার্ট কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আবহাওয়া ও মাটির তথ্যভিত্তিক চাষাবাদ। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর, আইওটি প্রযুক্তি ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা, পিএইচ, তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা সম্ভব হচ্ছে। এতে কৃষক সময়মতো সেচ, সার প্রয়োগ ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা করতে পারছেন। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, বরং উৎপাদন খরচও কমায়।
খরা ও পানিসংকট মোকাবিলায় পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ড্রিপ ইরিগেশন, স্প্রিংকলার সেচ ও মালচিং পদ্ধতি মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও খাল-পুকুর পুনঃখননের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। কৃষিতে পানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন বড় হুমকির মুখে পড়বে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে লবণসহিষ্ণু, খরাসহিষ্ণু ও স্বল্পমেয়াদি জাতের ফসল উদ্ভাবনও অত্যন্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান জলবায়ু সহনশীল ধান ও অন্যান্য ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাত কৃষকের কাছে সহজলভ্য করতে হবে এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষিতে জৈবপদার্থের ব্যবহার বাড়ানোও সময়ের দাবি। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মাটির স্বাভাবিক গুণ নষ্ট করছে। জৈবসার, কম্পোস্ট ও ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব। গাছভিত্তিক কৃষি বা অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি ব্যবস্থাও জলবায়ু সহনশীল কৃষির একটি কার্যকর উপায়। গাছ মাটির ক্ষয়রোধ করে, কার্বন শোষণ করে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এছাড়া কৃষকদের জলবায়ু সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। অনেক কৃষক এখনও আবহাওয়ার পরিবর্তন ও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম ও ডিজিটাল তথ্যসেবা বাড়াতে হবে। কৃষকের হাতে সঠিক তথ্য পৌঁছে গেলে তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং ক্ষতির পরিমাণ কমাতে সক্ষম হবেন।
সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া জলবায়ু সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। কৃষকের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ, ফসল বীমা, দুর্যোগকালীন সহায়তা ও বাজারব্যবস্থা উন্নয়ন অত্যন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষক বরাবরই সংগ্রামী। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন কিংবা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা দেশের খাদ্য উৎপাদনের চাকা সচল রেখেছেন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জটিল। তাই এখন শুধু প্রচলিত কৃষি পদ্ধতিতে নির্ভর করলে চলবে না; প্রয়োজন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পরিবেশ সচেতনতার সমন্বয়ে নতুন কৃষি ভাবনা।
জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়; এটি এখন কৃষকের মাঠে, মাটিতে ও জীবনে দৃশ্যমান বাস্তবতা। কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ কৃষি বাঁচলে খাদ্যনিরাপত্তা বাঁচবে, গ্রাম বাঁচবে, অর্থনীতি বাঁচবে। আর জলবায়ু সহনশীল স্মার্ট কৃষিই হতে পারে ভবিষ্যতের নিরাপদ ও টেকসই কৃষির সবচেয়ে বড় ভরসা।
লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।


