আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে: বিশ্ব দুগ্ধ দিবস ১ জুন ২০২৬

বিশেষ ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

কৃষিবিদ ড. এস. এম. রাজিউর রহমান:প্রতি বছরের ন্যায় ১ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব দুগ্ধ দিবস’। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) কর্তৃক ২০০১ সালে ঘোষিত এই দিবসটি দুগ্ধ খাতের গুরুত্ব, পুষ্টিগুণ এবং এর সাথে জড়িত সকল অংশীজনের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার এক অনন্য উপলক্ষ।

২০২৬ সালের এই বিশেষ দিনে আমাদের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়: “Celebrating Women Farmers” (নারী কৃষকদের উদযাপন), যা জাতিসংঘের ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ’ (International Year of the Woman Farmer) এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে।

দুগ্ধ শিল্পে নারী কৃষকদের অবদান
দুগ্ধ উৎপাদন ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে নারী কৃষকদের অংশগ্রহণ ও শ্রম অপরিসীম। পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে খামারের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা—সর্বত্রই নারীদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। বিশ্ব দুগ্ধ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আমরা সেই অদম্য নারী কৃষকদের সম্মান জানাই, যারা মেধা, কঠোর পরিশ্রম এবং উদ্ভাবনী কৌশলের মাধ্যমে টেকসই দুগ্ধ উৎপাদন ও আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা কেবল দুধ উৎপাদনই করছেন না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও টেকসই করে তুলছেন।

পুষ্টি ও মেধার বিকাশে দুধের অপরিহার্যতা
দুধকে বলা হয় প্রকৃতির এক অনন্য উপহার বা ‘সুপারফুড’। সুস্থ সন্তান ও একটি মেধাবী জাতি গঠনের পূর্বশর্ত হলো সুষম পুষ্টি, যার অপরিহার্য অংশ হলো প্রতিদিন নিরাপদ দুধ গ্রহণ। দুধে বিদ্যমান পানি, আমিষ, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিড শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে অত্যন্ত কার্যকরী।
সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে চাই সুস্থ জাতি, আর  সুস্থ জাতি পেতে হলে চাই মেধাসম্পন্ন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী সন্তান। তাই আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা হোক মঙ্গলের কবি ভারতচন্দ্র  রায়গুণাকরের সেই কালজয়ী উক্তি ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’।

নিরাপদ দুধ উৎপাদন ও ডেইরি বোর্ডের ভূমিকা
পুষ্টির উৎস হিসেবে দুধের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও, বর্তমানে আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘নিরাপদ দুধ’ নিশ্চিত করা। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে দুগ্ধ উৎপাদন না বাড়ায় অনেক ক্ষেত্রে ভেজালের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ক্ষতিকর অণুজীব, অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ বা রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত দুধ জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।  টেকসই দুগ্ধ শিল্প গড়া এবং নিরাপদ দুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ‘ডেইরি বোর্ড’ বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে দুগ্ধ শিল্পের মান নিয়ন্ত্রণ, খামারিদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারজাতকরণে ‘ডেইরি বোর্ডের’ ভূমিকা অনস্বীকার্য: 
•    নিরাপদ দুধের মান নিয়ন্ত্রণ: খোলা বাজারে দুধের ভেজাল রোধ এবং দুধের গুণমান নিশ্চিত করতে দুগ্ধ বোর্ড কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ ও তদারকি করতে পারে । 
•    খামারিদের প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ: খামারিদের আধুনিক প্রযুক্তি, গুড এনিমেল হাজবেন্ড্রি প্রাক্টিস ও হাইজেনিক প্রাক্টিস সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করতে বোর্ডের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ । 
•    অবকাঠামো উন্নয়ন: দুধ শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন, উন্নত ল্যাবরেটরি তৈরি এবং সাপ্লাই চেইন বা কুল চেইন সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দুগ্ধশিল্পের অবকাঠামো উন্নয়নে বোর্ড চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে । 
•    পলিসি ও সঠিক ব্যবস্থাপনা: নিরাপদ ও পুষ্টিকর দুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বয়ে সঠিক পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে দুগ্ধ বোর্ড কার্যকর ভূমিকা রাখে । 
নিরাপদ দুধ নিশ্চিত করতে হলে আমাদের নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে:
•    গুড এনিমেল হাজবেন্ড্রি প্রাক্টিস: গবাদি পশুর রোগ নিয়ন্ত্রণে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার ও নির্দিষ্ট প্রত্যাহার কাল (Withdrawal period) কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
•    কুল চেইন ব্যবস্থাপনা: উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দুধের গুণমান বজায় রাখতে কোল্ড চেইন ফ্যাসিলিটি ও আধুনিক শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি।
•    সচেতনতা ও নীতিমালা: পাস্তুরাইজড দুধের ব্যবহার বৃদ্ধিতে জনগণকে উৎসাহিত করা এবং সরকার কর্তৃক মান নিয়ন্ত্রণের জন্য উন্নত ল্যাবরেটরি ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

উপসংহার
বিশ্ব দুগ্ধ দিবস ২০২৬-এর এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক নারী কৃষকদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি পরিবারের  খাবারে নিরাপদ দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। নারী কৃষকদের দক্ষতাকে সম্মান জানিয়ে, আধুনিক প্রযুক্তি ও সুষম নীতিমালার সমন্বয়ে আমরা একটি পুষ্টিকর ও মেধাবী জাতি গড়ে তুলতে পারি। নিরাপদ দুধ উৎপাদন, বিপনণ ও বিতরণ নিশ্চিত করে, পরিবারের সকলকে দুধ খেতে উৎসাহিত করতে হবে। পরিবারের প্রতিটি সন্তানকে দুধে-ভাতে রাখতে পারলে দেশ পাবে মেধাসম্পন্ন একটি সুস্থজাতি। আসুন, টেকসই দুগ্ধ শিল্প গড়ি এবং আমাদের আগামী প্রজন্মকে সুস্থ ও সবল রাখি। আরো তথ্যের জন্য এবং দুগ্ধ শিল্পের টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখতে ভিজিট করুন: World Milk Day 2026 Activation Guide

-লেখক (ইকো-সিকিউরিটি/এসএসআইএল, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মিথেন নির্গমন এবং কার্বন ফাইন্যান্স প্রকল্প) একজন জাতীয় উপদেষ্টা। তিনি জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থার (UNIDO) সাবেক জাতীয় গবাদিপ্রাণিও দুগ্ধ বিশেষজ্ঞ এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) সাবেক জাতীয় প্রকল্প সমন্বয়কারী।