পাবলিক বনাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে বিতর্ক কতটুকু যৌক্তিক?

বিশেষ ফিচার
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

প্রফেসর ড. মোঃ আসাদুজ্জামান সরকার:পাবলিক বনাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার বিতর্কটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে কেবল দীর্ঘস্থায়ীই নয়, এটি অত্যন্ত আবেগ এবং সামাজিক ধারণানির্ভর।

প্রতি বছর ভর্তি পরীক্ষার মৌসুম এলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় এই প্রশ্নটি তীব্রভাবে সামনে আসে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই দুই খাতের উচ্চশিক্ষাকে কেবল "পাবলিক" বা "প্রাইভেট" মালিকানার ভিত্তিতে বিচার করা ক্রমেই একপেশে এবং অযৌক্তিক হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের অভূতপূর্ব সম্প্রসারণের ফলে এখন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট সংখ্যা ১৬০টি অতিক্রম করেছে। এই বিশাল পরিবর্তনের পর প্রকৃত প্রশ্নটি আর "পাবলিক বনাম প্রাইভেট" দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এখন মূল বিবেচ্য বিষয় হলো "কোন বিশ্ববিদ্যালয় কতটা মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছে"। উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হলো জ্ঞান সৃষ্টি, মানসম্মত গবেষণা, আন্তর্জাতিকীকরণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। তাই যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার গবেষণা উৎপাদন, শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং কর্মসংস্থান সক্ষমতার ভিত্তিতে, কেবল তার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের মোড়কে নয়।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের গবেষণার ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। দীর্ঘ একাডেমিক ঐতিহ্য এবং বিপুল সংখ্যক অভিজ্ঞ গবেষক থাকার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক উদ্ধৃতির (citation) ক্ষেত্রে এখনও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাঙ্কিংয়ের অন্যতম প্রধান সূচক যেহেতু গবেষণা এবং এর বৈশ্বিক প্রভাব, তাই এই প্রতিষ্ঠানগুলো আজও দেশের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে গত এক দশকে এই চিত্রে একটি বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার ক্ষেত্রে অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এবং ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা জার্নালে নিয়মিত গবেষণা প্রকাশ করছে এবং বিদেশি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে। ২০২৬ সালের গবেষণা-ভিত্তিক বিভিন্ন র‍্যাঙ্কিংয়েও দেখা গেছে যে, শীর্ষ গবেষণা প্রকাশনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমকক্ষ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। ফলে "বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না"- এমন প্রচলিত ধারণাটি এখন আর বাস্তবতার সঙ্গে বিন্দুমাত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

শিক্ষার মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির বিচারে এই দুই খাতের নিজস্ব কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা। দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পায়, যার ফলে এখানকার একাডেমিক পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সক্ষমতা অত্যন্ত উচ্চমানের হয়। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, শক্তিশালী ও বিস্তৃত অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক এবং নামমাত্র খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য বড় আকর্ষণ। অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তির জায়গাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা আধুনিক অবকাঠামো, সুসজ্জিত ও প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ, উন্নত ল্যাব সুবিধা এবং নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে একটি সেশনজটমুক্ত একাডেমিক ক্যালেন্ডার বজায় রাখতে পেরেছে। অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সময়মতো ডিগ্রি সম্পন্ন করার সুবিধা এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক হিসেবে মনে করেন। এছাড়া, বর্তমান চাকরির বাজারের আন্তর্জাতিক চাহিদা মাথায় রেখে শিল্পখাতের সাথে সরাসরি সংযোগ এবং বাস্তবমুখী পাঠক্রম প্রণয়নে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে।

তবে মুদ্রার অপর পিঠে তাকালে দেখা যায়, উভয় খাতই নিজস্ব কিছু বড় বড় চ্যালেঞ্জ এবং সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে তীব্র শিক্ষক সংকট, প্রতিকূল শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, আবাসন ও হল সংকট এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে নিয়মিত হিমশিম খাচ্ছে। পর্যাপ্ত আধুনিক ল্যাব ও গবেষণা তহবিলের ঘাটতিও অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে দৃশ্যমান, যার ওপর আবার যুক্ত হয় অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক প্রভাব। অপরদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধানতম সমস্যা হলো তাদের মধ্যকার চরম মানের বৈষম্য। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেও, একটি বড় অংশ এখনও ন্যূনতম একাডেমিক মান বজায় রাখতেই লড়াই করছে। এছাড়া গবেষণা তহবিলের তীব্র সীমাবদ্ধতা এবং খণ্ডকালীন শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এই খাতের সামগ্রিক মানোন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই খাতের ভেতরে বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে মানের এই বিশাল ফারাক প্রমাণ করে যে, ঢালাওভাবে কোনো এক পক্ষকে ভালো বা মন্দ বলা একেবারেই অনুচিত।

যদি আন্তর্জাতিক বাস্তবতার দিকে লক্ষ করা যায়, তবে দেখা যাবে যে উচ্চশিক্ষার উৎকর্ষতা কোনো নির্দিষ্ট মালিকানা কাঠামোর একক সম্পত্তি নয়। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানই সমান দাপটের সঙ্গে টিকে আছে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় যেমন বিশ্বসেরা ও গবেষণায় অগ্রগামী, তেমনি সরকারি খাতের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলে বা ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানও সমভাবে শক্তিশালী ও বিশ্বনন্দিত। অর্থাৎ, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নির্ভর করে তার অভ্যন্তরীণ গবেষণা সংস্কৃতি, অর্থায়ন, যোগ্য নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং শিক্ষকতার গুণগত মানের ওপর; সেটি সরকারি নাকি বেসরকারি তহবিলে চলে, তার ওপর নয়। বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় কর্মসংস্থানের বাজারও এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ করছে। নিয়োগদাতারা এখন আর প্রার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের "ট্যাগ" দেখে চাকরি দিচ্ছেন না। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির চেয়ে প্রার্থীর প্রকৃত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, যোগাযোগক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা এবং বাস্তব গবেষণা অভিজ্ঞতাকে সবচেয়ে বেশি মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, পাবলিক বনাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দীর্ঘ দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকলে উচ্চশিক্ষা খাতের মূল সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যাবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের স্বার্থে এই অপ্রয়োজনীয় ও কৃত্রিম বিভাজনকে অতিক্রম করা এখন সময়ের দাবি। জ্ঞান সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক পরিচয় শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে স্থান পায় না, বরং তার প্রকৃত অবদানই টিকে থাকে। তাই "কে ভালো—পাবলিক নাকি প্রাইভেট?" এই পুরোনো ও অচল বিতর্কের চেয়ে আজকের দিনে সবচেয়ে যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী প্রশ্ন হওয়া উচিত-"কোন বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান, আধুনিক দক্ষতা ও গবেষণায় সবচেয়ে বেশি সক্ষম করে তুলছে?" দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ মানোন্নয়ন, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি এবং একটি টেকসই উদ্ভাবনী সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়কে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে, জাতীয় উন্নয়নের সমান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উভয় খাতের শক্তি ও সম্ভাবনাকে সম্মিলিতভাবে কাজে লাগাতে পারলেই কেবল বৈশ্বিক দরবারে দেশের উচ্চশিক্ষাকে মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করা সম্ভব।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ