ক্লাইমেট অ্যাকশন, সময়ের আহ্বান

সমসাময়িক
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

সমীরণ বিশ্বাস:প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে এই দিবসের সূচনা হয় এবং তারপর থেকে পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির অন্যতম আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য “Climate Action” (জলবায়ু পদক্ষেপ)। এ প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় ব্যক্তি, সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে দ্রুত, কার্যকর এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা।

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি আজকের বাস্তবতা। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ঘন ঘন বন্যা, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, সবই জলবায়ু পরিবর্তনের দৃশ্যমান প্রভাব। তাই জলবায়ু রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা মানবজাতির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

জলবায়ু পরিবর্তন: কেন উদ্বেগের বিষয় ?

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি। শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দূষণকারী কার্যক্রমের ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এসব গ্যাস পৃথিবীর চারপাশে একটি আবরণ তৈরি করে, যা সূর্যের তাপ আটকে রাখে এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে পৃথিবীর স্বাভাবিক জলবায়ু ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। ঋতুচক্রের পরিবর্তন, তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধি, মেরু অঞ্চলের বরফ গলন এবং চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো এর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশ: জলবায়ু পরিবর্তনের সামনের সারির দেশ:

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল এবং উচ্চ জনঘনত্বের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লবণাক্ততা বাড়ছে, কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে খরা এবং তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ছে। বর্ষাকালে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যা কৃষি উৎপাদনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এখন শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।

কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব:

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি কৃষি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধান, গম, ভুট্টা ও সবজি ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। ফুল ঝরে যাওয়া, পরাগায়নে সমস্যা, দানার অপূর্ণতা এবং ফলন হ্রাসের মতো ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। খরা পরিস্থিতিতে সেচের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা ফসলের ক্ষতি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং লাভ কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত জাতের ফসল এবং স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ক্লাইমেট অ্যাকশন কী ?

“ক্লাইমেট অ্যাকশন” বলতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ ও প্রভাব মোকাবিলায় গৃহীত সব ধরনের কার্যকর পদক্ষেপকে বোঝায়। এটি কেবল সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থার কাজ নয়; ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রতিটি মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। ক্লাইমেট অ্যাকশনের মূল উদ্দেশ্য হলো;  গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি। বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। টেকসই কৃষি ও শিল্পায়ন নিশ্চিত করা। জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি। পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গড়ে তোলা। কৃষিতে ক্লাইমেট অ্যাকশন।  কৃষি খাতে জলবায়ু পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ব্যবহার করে কৃষিকে আরও টেকসই ও সহনশীল করা সম্ভব।

 কার্বন স্মার্ট কৃষি: কার্বন স্মার্ট কৃষি এমন একটি পদ্ধতি, যা কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমায় এবং মাটিতে কার্বন সংরক্ষণে সহায়তা করে। জৈব সার ব্যবহার, ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং সংরক্ষণশীল চাষাবাদ এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার: ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং IoT-ভিত্তিক মাটি বিশ্লেষণ কৃষকদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছে। এর ফলে সারের অপচয় কমে, পানির সাশ্রয় হয় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।

পানি ব্যবস্থাপনা: ড্রিপ সেচ, স্প্রিংকলার সেচ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত কার্যকর। এতে পানির অপচয় কমে এবং খরার সময় কৃষি উৎপাদন বজায় রাখা সম্ভব হয়।

জলবায়ু সহনশীল জাত: লবণাক্ততা, খরা, বন্যা ও তাপমাত্রা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ:

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বনভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই বন সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ ক্লাইমেট অ্যাকশনের অন্যতম প্রধান উপাদান। প্রতিটি মানুষ যদি বছরে অন্তত একটি করে গাছ রোপণ ও পরিচর্যা করে, তাহলে পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক বন ও জলাভূমি রক্ষা করতে হবে, কারণ এগুলো জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আবাসস্থল।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব:

জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও বায়োগ্যাসের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। এসব জ্বালানি পরিবেশবান্ধব এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ইতোমধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় সোলার হোম সিস্টেম এবং কৃষিতে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ জলবায়ু পদক্ষেপের একটি ইতিবাচক উদাহরণ।

ব্যক্তি পর্যায়ে ক্লাইমেট অ্যাকশন:

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় শুধু বড় প্রকল্প নয়, ছোট ছোট ব্যক্তিগত উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাইলে,  অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে পারি। প্লাস্টিকের ব্যবহার সীমিত করতে পারি। গণপরিবহন ব্যবহার করতে পারি। বৃক্ষরোপণ করতে পারি। পানি অপচয় রোধ করতে পারি। পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহার করতে পারি। বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহার করতে পারি। এই ছোট পদক্ষেপগুলো সম্মিলিতভাবে বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা:

জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সবচেয়ে বেশি বহন করবে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম। তাই তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া কার্যকর ক্লাইমেট অ্যাকশন সম্ভব নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিবেশ ক্লাব, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জলবায়ু বিষয়ক গবেষণা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম তরুণদের সম্পৃক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরিবেশ সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়াও সময়ের দাবি।

টেকসই উন্নয়ন ও ক্লাইমেট অ্যাকশন:

টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হলো পরিবেশ সংরক্ষণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশগত ভারসাম্যের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষি এবং নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু বিষয়ক ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-এর ১৩ নম্বর লক্ষ্যই হলো Climate Action. এই লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য “Climate Action” আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই। প্রকৃতি আমাদের জীবনের ভিত্তি, আর সেই ভিত্তি আজ হুমকির মুখে। তাই ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র, কৃষক থেকে বিজ্ঞানী, শিক্ষার্থী থেকে উদ্যোক্তা, সবার সম্মিলিত উদ্যোগই পারে একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে। জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একক দেশের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা এবং বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ।

আসুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এ আমরা সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, পরিবেশ বাঁচাই, জলবায়ু রক্ষায় এগিয়ে আসি। জলবায়ু রক্ষায় আজই কার্যকর পদক্ষেপ নিই, গড়ে তুলি একটি সবুজ, নিরাপদ ও টেকসই পৃথিবী। প্রকৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষা শুধু বর্তমানের প্রয়োজন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা। আসুন, সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একসাথে কাজ করি। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এর অঙ্গীকার হোক, জলবায়ু পদক্ষেপে আজকের উদ্যোগ, আগামীর সবুজ পৃথিবী।

লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।