
ডক্টর এএইচএম সাদেক:ব্রেটন উডস থেকে নিক্সন শকের মাধ্যেম পেট্রোডলার সাম্রাজ্য গড়ে উঠে। পেট্রোডলার (Petrodollar) সাধারণভাবে সেই মার্কিন ডলারকে বোঝায় যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কেনাবেচার প্রধান মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সহজভাবে বললে, বিশ্ববাজারে তেল কিনতে হলে বিশ্বের দেশগুলো মার্কিন ডলার ব্যবহার করতে হয় বা করতে বাধ্য । ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে (Global economy) ডলারের চাহিদা স্থায়ীভাবে বজায় থাকে। ব্যতিক্রম কয়েকটি দেশ বাদে প্রায় সবাই ডলার ব্যবহার করে। এই ব্যবস্থার কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশকে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার (foreign currency) রিজার্ভে ডলার রাখতে হয়।
পেট্রোডলারের আগের কাহিনী বা কি ঘটনা ঘটেছিল ?
ব্রেটন উডস ব্যবস্থা (Bretton Woods System) :
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস (Bretton Woods) শহরে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিরা এক সম্মেলনে অংশ নেয়। এই সম্মেলন ব্রেটন উডস সম্মেলন (Bretton Woods Conference)। মূল উদ্দেশ্য ছিল ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য বৃদ্ধি ও মুদ্রা বিনিময় স্থির করা। তখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ব্রেটন উডস চুক্তি (Bretton Woods Agreement) হয়। মূলত ব্রেটন উডস এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে এই ব্রেটন উডস সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে ডলারের আধিপত্য শুরু হয়।এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল অর্থাৎ এখানে সিদ্ধান্ত হয়-
১। বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র হবে মার্কিন ডলার অর্থাৎ বিশ্বের কেন্দ্রীয় মুদ্রা হবে ডলার, আর তখন থেকে ডলারকে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা করা হয়। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি অনেকটা মার্কিন মুদ্রা ডলারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
২। মার্কিন ডলারকে সরাসরি স্বর্ণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ডলার–স্বর্ণ সম্পর্ক মান। ডলার স্বর্ণের সম্পর্ক মান মানে—মার্কিন ডলারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণের সাথে সরাসরি বিনিময়যোগ্য করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ডলার থাকলে নির্দিষ্ট হারে তা স্বর্ণে বদলানো যেত। যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে যে, ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৫ ডলার। অন্য দেশগুলোর মুদ্রাও ডলারের সাথে যুক্ত ছিল। তাই তখন ডলার “কাগজের টাকা” হলেও এর পেছনে স্বর্ণের সমর্থন ছিল। যে কোনো দেশ চাইলে তাদের ডলার দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ নিতে পারবে। এই কারণে ডলার কার্যত বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হয়ে যায়।
৩। অন্যান্য দেশের মুদ্রা ডলারের সঙ্গে নির্দিষ্ট হারে বাঁধা থাকবে। অর্থাৎ গোল্ড→ ডলার →অন্যান্য কারেন্সি।
এই সময় ব্রেটন উডস সম্মেলনের মাধ্যমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়।
ক) আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (International Monetary Fund-IMF) - বিশ্ব মুদ্রা স্থিতিশীল রাখা এবং অর্থনৈতিক সংকটে দেশগুলোকে ঋণ দেওয়া।
খ) বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) - ২য় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর পুনর্গঠন ও উন্নয়ন অর্থায়ন করা।
ব্রেটন উডস ব্যবস্থা (Bretton Woods System) প্রায় ২৫ বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। তারপর ১৯৭১ সালে নিক্সন শখের মাধ্যমে ব্রেটন উডস ব্যবস্থার পতন হয় । ফলস্বরূপ বিশ্বে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং বর্তমান ভাসমান মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা (floating exchange rate) চালু হয়।
নিক্সন শক (Nixon Shock) :
ডলার–স্বর্ণ সম্পর্ক- ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন (Richard Nixon) ঘোষণা করেন যে, ডলার আর স্বর্ণে রূপান্তরযোগ্য থাকবে না। ডলার সোনার সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেন। ডলারকে স্বর্ণের সাথে বিনিময়ের ব্যবস্থা বাতিল করেন। বিশ্বে ঘটে যাওয়া এই সিদ্ধান্তকে নিক্সন শক (Nixon Shock) বলে থাকেন। এ ঝাঁকুনির (Shock) মাধ্যমে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা কার্যত শেষ হয়ে যায়। এর ফলে ডলারের মূল্য আর স্বর্ণের উপর নির্ভরশীল রইল না। তখন যুক্তরাষ্ট্র নতুনভাবে ডলারের চাহিদা তৈরি করার পথ খুঁজতে থাকে।
নিক্সন কেন এমন করেছিলেন- উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন (Richard Nixon) কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
ব্রেটন উডস চুক্তির (১৯৪৪) নিয়ম ছিল—বিদেশি সরকার চাইলে তারা ডলার দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ নিতে পারবে। ফলে বিদেশি দেশগুলো, যেমন ফ্রান্স, তৎকালীন ফ্রান্সের প্রসিডেন্ট চার্লস দে গল (Charles de Gaulle) ডলার বদলে স্বর্ণ নিতে শুরু করেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণ ভাণ্ডার দ্রুত কমে যাচ্ছিল। একই সঙ্গে বড় বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়, কারণ আমেরিকার কাছে অনেক ডলার আসল ঠিকই কিন্তু বিদেশি পণ্য আমদানি বেড়ে গেল। তাছাড়া কয়েকটি কারণে ১৯৬০–৭০ দশকে মার্কিন অর্থনীতি বড় চাপে পড়ে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিশাল যুদ্ধ ব্যয় মেটাতে মার্কিন অর্থনীতি সংকটে পড়ে। অন্যদিকে ইউরোপ ও জাপানের অর্থনৈতিক উত্থান ঘটে। বিদেশে বিপুল ডলার ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণ ভাণ্ডার দ্রুত কমে যেতে থাকে। ডলারের মান ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। এসব কারনে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা ১৯৭১–৭৩ সালের মধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় বা বাতিল করেন।
আসা যাক পেট্রোডলার রহস্য, পেট্রোডলারের জন্ম, পেট্রোডলার চুক্তি ((১৯৭৩–৭৪) :
ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ১৯৬০ সালে ওপেক - OPEC (Organization of the Petroleum Exporting Countries) প্রতিষ্ঠিত হয়। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন বা জোট, যার প্রধান উদ্দেশ্য বিশ্ববাজারে তেলের উৎপাদন, দাম নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করা। তেল উৎপাদনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ সৌদি আরব এবং ওপেকের (OPEC) প্রধান শক্তি। এই সৌদি আরব ১৯৭৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা চুক্তি করে।
এই চুক্তি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়—
ক) সৌদি আরব শুধুমাত্র ডলারে তাদের তেল বিশ্বে বিক্রি করবে।
খ) তেল থেকে অর্জিত অর্থ আবার মার্কিন ব্যাংক, অস্ত্র বানিজ্য ও ট্রেজারিতে বিনিয়োগ করবে।
গ) বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি রাজতন্ত্রকে সামরিক সুরক্ষা ও অস্ত্র সরবরাহ করবে অর্থাৎ নিরাপত্তা প্রদান করবে ।
এরপর সৌদি আরবের দেখাদেখি ওপেকভূক্ত (OPEC) অন্যান্য দেশগুলোও তেল বিক্রির জন্য প্রধান মুদ্রা হিসেবে ডলার গ্রহণ করে। মূলত সমীকরণ এমন যে, তেলকে ডলারের সাথে বেঁধে ফেলা। সৌদি আরবের সাথে "পেট্রোডলার চুক্তির" (১৯৭৪) মাধ্যমে এভাবেই তেল সমান ডলারের সমীকরণ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর জন্ম হয় পেট্রোডলার ব্যবস্থার। শুরু হয় "পেট্রোডলার যুগ"।
পেট্রোডলার কিভাবে বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে ?
যেহেতু তেল বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি, তাই তেল কিনতে সব দেশকে ডলার সংগ্রহ করতে হয়। তেল কিনতে হলে ডলার লাগবে। ফলে বিশ্বব্যাপী ডলারের চাহিদা স্থায়ীভাবে তৈরি হয়। আর বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে ডলার স্থায়ী নোটে পরিনত হয় বা বৈশ্বিক চাহিদা পূরণে ডলার অপরিহার্য ও বাধ্যতামূলক হয়। ডলার বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্র দখল করে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্য, ক্রয়-বিক্রয়ে ডলার অপরিহার্য বিধায়, অধিকাংশ দেশ বাধ্যতামূলক ডলার রিজার্ভ রাখতে হয়।
"পেট্রোডলার রিসাইক্লিং”
মজার ব্যাপার হলো এই পেট্রোডলার আবার রিসাইক্লিং হয়। কিভাবে ? —তেল বিক্রি করে যে বিপুল ডলার তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো অর্জন করে, সেই ডলার আবার বিভিন্ন উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থায় ফিরে আসে।
পেট্রোডলার ব্যবস্থার কারনে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তেল বিক্রির বিপুল ডলার তারা শুধু জমিয়ে রাখে না। বরং—এ ডলার রিসাইক্লিং হয়। কিভাবে রিসাইক্লিং হয়? এই ডলার
আমেরিকার ব্যাংকে জমা রাখে। World Bank বা আন্তর্জাতিক ব্যাংকের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে। তেল বিক্রয়কারী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ড (Treasury bond) কিনে। আমেরিকা থেকে অস্ত্র, প্রযুক্তি ও পণ্য কিনে। ফলে তেল বিক্রি করে তারা যে ডলার অর্জন করে, সেই ডলার আবার ঘুরেফিরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ফিরে আসে। বিশ্ব অর্থনীতিতে একই ঘটনা ঘটে। এই ঘুরে আসার প্রক্রিয়াই পেট্রোডলার রিসাইক্লিং। পেট্রোডলারের কেরামতি এখানেই। ডলার ভাসমান কিন্তু ক্ষমতা বিশাল ও অটুট। স্বর্ণের সঙ্গে ডলারের সম্পর্ক ছিন্ন হলেও আমেরিকা এভাবেই ডলারের বিশ্ব আধিপত্য হারাতে দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত দেশ হলেও তার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে না। আমেরিকার প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ। সবাই যদি ঋণ ফেরত চায় তাহলে ৮০০ বছরেও ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না। মজার বিষয়, আমেরিকা সহজেই অর্থ ছাপিয়ে অর্থনীতি চালাতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশই (চীন, জাপান, আরো অনেক দেশ) আসলে আমেরিকাকে ঋণ দেয় এবং ডলার ব্যবহার করে। মার্কিন সরকার ঋণ নিলেও সেই টাকা আবার তাদের কাছেই ফিরে আসে। ধরুন, একটি গ্রামে একটি বড় দোকান আছে। সেই দোকানদার গ্রামের সবার কাছ থেকে ঋণ বা ধার নেয়, আবার গ্রামের সবাই সেই দোকান থেকেই পণ্য কেনাকাটা করে। ফলে টাকা আবার দোকানদারের কাছেই ফিরে আসে। এভাবেই দোকানদার ঋণ বা ধার নিয়েও খুব ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে।
তেল রাজনীতির মাধ্যমে জোট নিয়ন্ত্রণ করে।মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার নিচে এভাবে আরবের মাটি তথা মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্র কায়েম করেছে । বিশেষ করে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডানের গালফ জোট কেবল নিরাপত্তা নয়, ডলারভিত্তিক তেল বাণিজ্য বজায় রাখার একটি কাঠামোও বটে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মূলত পেট্রোডলার রক্ষা, তেলের নিয়ন্ত্রণ ও মুসলিম বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের জন্য আমেরিকা শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি উপস্থিতি বজায় রাখে।
ভূরাজনীতি নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী অস্ত্র হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ। যেহেতু আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থার কেন্দ্র হচ্ছে ডলার, তাই যুক্তরাষ্ট্র সহজেই অন্য দেশকে অর্থনৈতিকভাবে চাপ দিতে পারে। ডলারকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) মূলত ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার কারণে অধিক কার্যকর হয়।
ইতিপূর্বে কিছু দেশ ডলার ছাড়া তেল বিক্রির চেষ্টা করে বড় রাজনৈতিক চাপ ও ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ইউরোতে তেল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিলেন । ফলে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে রাসায়নিক অস্ত্র থাকার অভিযোগে ইরাকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটায় এবং প্রহসনের বিচার করে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি আফ্রিকান স্বর্ণমুদ্রায় তেল বিক্রির পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিনতি ২০০৩–২০১১ সালে পশ্চিমা দেশগুলো লিবিয়ার ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ বৃদ্ধি করে।লিবিয়ার পতন ঘটায় ও গাদ্দাফি হত্যা করা হয়।
ভেনেজুয়েলা ডলার ছাড়া তেল বিক্রি করতে চেয়েছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে এবং অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। ভেনিজুয়েলা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গুন্ডামী কায়দা আমেরিকা ধরে নিয়ে যায়। আর বর্তমান ইরানে যা চলছে তার পেছনেও রয়েছে তেল আর ডলার সম্পর্ক। যখন কোনো দেশ চেষ্টা করে ডলার ছাড়া তেল বিক্রি করতে চায়, তখন ইতিহাস দেখিয়েছে যে তারা বড় রাজনৈতিক চাপ ও সমস্যার মুখোমুখি হয়। এই ঘটনাগুলো পেট্রোডলার তেলেসমাতি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি দেশ পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে। নতুন শক্তির উত্থান চীন ইউয়ানে তেল বাণিজ্যের চেষ্টা করছে। রাশিয়া ডলার এড়িয়ে নিজস্ব মুদ্রা রুবল বা বিকল্প ব্যবস্থায় বাণিজ্য করছে। তারা ডলার এড়িয়ে বাণিজ্য বাড়াচ্ছে। ইরান বিকল্প মুদ্রায় তেল বিক্রি করছে। দীর্ঘদিন ধরেই ডলারবিহীন তেল বাণিজ্যের চেষ্টা করছে।
ব্রিকস জোটের (BRICS) উদ্যোগ, বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা, বহুমুদ্রার নতুন বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। BRICS বহুমুদ্রা ব্যবস্থার উদ্যোগ নিচ্ছে। যদি ভবিষ্যতে তেল বাণিজ্যে বহু মুদ্রা ব্যবহার শুরু হয়, তাহলে ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে।
পেট্রোডলার কেবল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়, এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক শক্তি কাঠামো। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে "ডলার" বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখে। যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনীতি ও সামরিক শক্তি টিকিয়ে রাখে। চলমান ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের তেল রাজনীতি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়েছে। তবে নতুন শক্তির উত্থান এবং বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার কারণে ভবিষ্যতে পেট্রোডলার ব্যবস্থার প্রভাব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে পারে।
চলমান ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট। শক্তির ভারসাম্য ও মাল্টিপোলার বিশ্ব ব্যবস্থা পৃথিবীর ইতিহাসকে বদলে দিতে পারে, অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। সামনের পৃথিবী নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার ভার্সনে চলে যেতে পারে। আগামীর বিশ্ব ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে আমেরিকার একক আধিপত্য শক্তি থেকে ইরান ইসরায়েল আমেরিকার যুদ্ধের মাধ্যমে মাল্টিপোলার বিশ্ব ব্যবস্থা উত্থানের পথে অগ্রসর হচ্ছে। সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ বসবাসযোগ্য পৃথিবীর প্রত্যাশায় -----
























