
মুহাম্মদ রিয়াজ, এগ্রিলাইফ প্রতিনিধিঃইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ পরিচিত হলেও মাছ চাষের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের সুখ্যাতি রয়েছে। এলাকায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করতে মাছ চাষিদের বৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি বিষয়ক এক দিনের প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছে নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেড। “গুণগত খাদ্য পরিমিত পরিমাণ, মাছের বৃদ্ধি চাষির লাভ” প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ কর্মশালার সার্বিক সহযোগিতা করেছে ইউএস গ্রেইনস অ্যান্ড বায়োপ্রোডাক্টস কাউন্সিল (USGBC)।
আজ বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১১টায় শম্ভুগঞ্জ-এর একটি কমুউনিটিি সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ কর্মশালায় প্রায় ৭০ জন মৎস্যচাষি, ফিড ডিলার ও সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন। প্রশিক্ষণটি দুই প্রাণবন্ত সেশনে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সেশনে মাছের বৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং দ্বিতীয় সেশনে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. মহিউদ্দিন আমিরুল কবির চৌধুরী।
কর্মশালাকে আরও অংশগ্রহণমূলক করতে প্রশিক্ষণার্থীদের পাঁচটি দলে ভাগ করা হয়। প্রতিটি দল পুকুরের মাটি ও পানি ব্যবস্থাপনা, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ, পুকুরের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করে। পরে দলভিত্তিক তথ্যসমূহ উপস্থাপন করে একটি করে পোস্টার তৈরি করে প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানে নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেডের জুনিয়র এজিএম ওবায়দুল ইসলাম-এর সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন ইউএস গ্রেইনস অ্যান্ড বায়োপ্রোডাক্টস-এর গ্লোবাল স্ট্যাটিস্টিকস অ্যান্ড ট্রেড ম্যানেজার মার্ক সিভিয়ার, নারিশ পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি লিমিটেডের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের এভিপি মো. সামিউল আলিম, জিএম এস. এম এ. হক, সেলস অ্যান্ড সার্ভিস সিনিয়র ডিজিএম ড. মুহাম্মদ মুছা কালিমুল্লাহ, ইউএস গ্রেইনস অ্যান্ড বায়োপ্রোডাক্টসের কনসালটেন্ট মাহি আলম সারোয়ার, মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. মহিউদ্দিন আমিরুল কবির চৌধুরী ও নারিশের ফিড বিশেষজ্ঞ অং থোয়েন এ (অন্তু) সহ প্রায় ৭০ জন খামারি।
গ্লোবাল স্ট্যাটিস্টিকস অ্যান্ড ট্রেড ম্যানেজার মার্ক সিভিয়ার বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির কৃষক ও খামারিদের সমন্বয়ে গঠিত। ৯টি অফিসের মাধ্যমে আমরা ৭০টি দেশে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের মৎস্যচাষিদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত করা, যাতে কম খরচে বেশি মাছ উৎপাদন সম্ভব হয়। খামারিরা প্রশিক্ষিত হলে দেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। পাশাপাশি দেশের অ্যাকুয়াকালচার সেক্টরকে আরও উন্নত পর্যায়ে উন্নীত করা যাবে।”
এভিপি সামিউল আলিম বলেন, “নিরাপদ খাদ্যের মাধ্যমে নিরাপদ পণ্য উৎপাদনই আমাদের লক্ষ্য। এই ক্ষেত্রে নারিশ সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে অ্যান্টিবায়োটিক ও কেমিক্যালমুক্ত মাছের খাদ্য উৎপাদন করে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ISO ও HACCP স্বীকৃত আমাদের ফিডে অতিরিক্ত মিনারেল বা ভিটামিন ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না।”
জিএম (সেলস্ এন্ড মার্কেটিং) এস. এম. এ. হক বলেন, “মাছ চাষে লাভবান হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি খামারির হাতে। পুকুরে অতিরিক্ত ঘনত্ব বাড়ালে লাভ নয়, ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। পুকুরের অক্সিজেন, অ্যামোনিয়া মাত্রা এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনার নিয়মাবলি জানা অত্যন্ত জরুরি। নারিশ ফিড ব্যবহারে পানির রঙের পরিবর্তন হয় না এবং মাছ সতেজ থাকে।”
মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. মহিউদ্দিন আমিরুল কবির চৌধুরী বলেন, “মাছ চাষের ক্ষেত্রে ভালো জাতের পোনা, মানসম্মত খাদ্য ও পুকুরের পরিবেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভালো খাদ্যের প্রোটিন ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হজমযোগ্য হয়। এতে পানির গুণাগুণ ভালো থাকে, মাছের মৃত্যু কমে এবং ওষুধের খরচ প্রায় থাকে না। নিম্নমানের খাবার ব্যবহার করলে পানির পরিবেশ নষ্ট হয় এবং মাছ স্ট্রেসে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন রোগে ভোগে।”
খ্যাতনামা নিউট্রিশনিস্ট ও ফিড বিশেষজ্ঞ অং থোয়েন এ (অন্তু) বলেন, “ফিডের মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো খাদ্য তৈরির মৌলিক উপাদানের সংকট ও বর্ধিত মূল্য। ভালো ফিডের দাম কিছুটা বেশি হলেও এর ফিড কনভার্সন রেশিও (FCR) ভালো হওয়ায় উৎপাদন বেশি হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না। কারণ পুকুরে এর ভবিষ্যত প্রভাব ভয়ংঙ্কর।”
শম্ভুগঞ্জের চেয়ারম্যান ফারুকুল ইসলাম বলেন, এই দেশের উৎপাদিত মাছ যেন বিদেশে রপ্তানি করা যায়। সেই ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। এই উদ্যোগের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ যেমন বাড়বে এবং খামারীরাও লাভবান হবে।
মৎস্যচাষি মুক্তার হোসেন বলেন, “দীর্ঘ ১০ বছর ধরে নারিশের ফিড ব্যবহার করছি। এ পর্যন্ত কোনো রোগ দেখা দেয়নি, লোকসানও হয়নি। নারিশ সত্যিই একটি ভালো পণ্য।”
পাবদা ও তেলাপিয়া খামারি মামুন শেখ বলেন, “আজকের প্রশিক্ষণটি খুবই চমৎকার। খাদ্য ব্যবস্থাপনা, পুকুরের পিএইচ নিয়ন্ত্রণ, অ্যামোনিয়া ব্যবস্থাপনা ও পোনা ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো শিখেছি। এয়ারেটর ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক দিকও জানা গেছে। আশা করি এগুলো প্রয়োগ করলে লাভবান হতে পারব।”
শিং মাছ চাষি আব্দুর রহিম বলেন,“নারিশের ফিড ব্যবহারে শিং মাছের উৎপাদন বেড়েছে এবং রোগ কমেছে। অতিরিক্ত কোনো ভিটামিন বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়নি। ফলে মাছের ওজনও বেশি হয়।”
এই প্রশিক্ষণ মাঠে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। পাবদা, কই, শিংয়ের পাশাপাশি পাঙ্গাশ-তেলাপিয়ার বাজার ধরতে এ ধরনের দক্ষতা জরুরি। নারিশ ফিড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চাহিদা মেটাতে দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় এলাকাতেও নিয়মিত এমন কর্মশালা চলবে।
























