বাংলাদেশে পেঁয়াজ চাষের আধুনিকায়ন: উৎপাদন বৃদ্ধিতে বীজ, সার ও রোগবালাই দমন প্রযুক্তি।

ড. মোঃ মাহফুজ আলম: বাংলাদেশে পেঁয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল যা মসলা ও সবজি উভয় হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৭ লক্ষ ৬৯ হাজার মেট্রিক টন।কৃষি প্রধান এ দেশে পেঁয়াজ একটি অতি প্রয়োজনীয় মসলা জাতীয় ফসল হিসেবে বিবেচিত। পেঁয়াজ শুধু খাদ্যের স্বাদ এবং ঘ্রাণ বৃদ্ধি করতেই নয়, এটি পুষ্টিগুণ এবং আর্থিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য তালিকায় পেঁয়াজ একটি অপরিহার্য উপাদান। পেঁয়াজ চাষ করে কৃষকেরা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখে। পেঁয়াজ চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হয় এবং প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়াও, পেঁয়াজ উৎপাদন সঠিকভাবে বৃদ্ধি করা গেলে আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পাবে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। বাংলাদেশে পেঁয়াজের উচ্চ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এর চাষাবাদ বাড়ানো কৃষি খাতের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। পেঁয়াজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে উন্নত জাত, সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং আধুনিক কৃষি পদ্ধতি নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। তবে পেঁয়াজ সংরক্ষণে পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব ও সময়মতো ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে অনেক চাষি হতাশ হন। এ সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে বাংলাদেশে পেঁয়াজ চাষের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

জমি তৈরি

পেঁয়াজ চাষের জন্য উপযুক্ত জমি ও মাটির নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেঁয়াজ চাষের জন্য মাঝারি উঁচু, পানি জমে না এমন এবং সুনিষ্কাশিত জমি সবচেয়ে উপযোগী। পানি জমে থাকলে পেঁয়াজের কন্দ পচে যেতে পারে, ফলে উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এ কারণে সঠিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক। মাটির ধরন হিসেবে বেলে দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি পেঁয়াজ চাষের জন্য আদর্শ। এই ধরনের মাটি সহজে পানি ও বাতাস চলাচল করতে দেয়, যা পেঁয়াজের মূল এবং কন্দের বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। মাটির পিএইচ মান ৬.০ থেকে ৬.৫ হল পেঁয়াজ চাষের জন্য আদর্শ। এ পিএইচ স্তরে মাটির পুষ্টি উপাদানগুলো গাছ সহজেই গ্রহণ করতে পারে। জমির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য জৈব সার যেমন গোবর সার, কম্পোস্ট এবং পচা খড় ব্যবহার করা। পেঁয়াজের ভালো বৃদ্ধির জন্য মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ এবং সালফারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।

এছাড়া, জমি চাষের আগে একাধিকবার চাষ ও মই দিয়ে জমি সমান এবং জৈব সার ব্যবহার করা। এতে বীজ বপন বা চারা রোপণের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়। একইসাথে জমি আগাছামুক্ত রাখা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আগাছা পেঁয়াজের বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে। পেঁয়াজের জন্য সঠিক জমি ও মাটি নির্বাচন এবং তার যথাযথ পরিচর্যা করলে ফসলের গুণগত মান এবং ফলন বৃদ্ধি পায়।

উন্নত জাত নির্বাচন

বাংলাদেশে পেঁয়াজের বিভিন্ন উন্নত জাতের মধ্যে স্থানীয় এবং হাইব্রিড জাতগুলো বেশি জনপ্রিয়। স্থানীয় জাতের মধ্যে তহুরা, বগুড়া লাল এবং ফরিদপুরী উল্লেখযোগ্য, যেগুলো সুস্বাদু ও সংরক্ষণ উপযোগী। অন্যদিকে, উচ্চফলিশীল জাতের মধ্যে বারি পেঁয়াজ১, বারি পেঁয়াজ২ এবং বারি পেঁয়াজ৩ অধিক ফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধী। এছাড়াও বারি পেঁয়াজ৪; উচ্চ ফলনশীল শীতকালীন জাত এবং বারি পেঁয়াজ৫, সারা বছর চাষযোগ্য উন্নত জাত, বিনা পিঁয়াজ-১ (গ্রীষ্মকালীন) ও বিনা পিঁয়াজ-২ (রবি),  লাল তীর হাইব্রিড পেঁয়াজ, লাল তীর কিং পেঁয়াজ,  লাল তীর ২০ এবং ACI-এর হাইব্রিড জাত 'বিপ্লব'। হাইব্রিড জাতগুলো স্বল্প সময়ে অধিক ফলন দেয় এবং সেচ, সার ও পরিচর্যার প্রতি অধিক সংবেদনশীল। তবে, স্থানীয় জাতগুলো দীর্ঘস্থায়ী এবং পরিবেশের সাথে বেশি মানানসই। উন্নত জাত নির্বাচন করলে কৃষকরা একই জমি থেকে অধিক ফলন এবং ভালো মানের পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পারেন। এর ফলে কৃষি খাতের লাভজনকতা বাড়ে এবং বাজারের চাহিদা মেটানো সহজ হয়। সঠিক জাত নির্বাচন পেঁয়াজ চাষের সফলতার মূল চাবিকাঠি। ভালো বীজ পানিতে দিলে ডুবে যাবে এবং চাপ দিলে ভাঙবে, চ্যাপ্টা হবে না।

চারা তৈরি

পেঁয়াজর চারা তৈরির পদ্ধতি সঠিকভাবে অনুসরণ করলে ভালো মানের এবং রোগমুক্ত চারা পাওয়া যায়, যা পরবর্তী চাষের ফলন নিশ্চিত করে। প্রথমে উঁচু ও সুনিষ্কাশিত জমি নির্বাচন করা হয়। জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করা হয় এবং আগাছা পরিষ্কার করা হয়। বীজতলায় জৈব সার যেমন গোবর সার ও কম্পোস্ট ভালোভাবে মিশিয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করা হয়। বীজতলায় পেঁয়াজের বীজ বপনের জন্য ১ মিটার প্রস্থ এবং প্রয়োজনমতো দৈর্ঘ্যের বেড তৈরি করা হয়। বেডের উচ্চতা ১৫-২০ সেন্টিমিটার রাখা হয়, যাতে পানি জমে না থাকে। প্রতি বর্গমিটারে ১০-১২ গ্রাম বীজ বপন করা হয় এবং বীজের উপর হালকা মাটি বা খড় বিছিয়ে দেওয়া হয়। বীজ বপনের পর নিয়মিত সেচ এবং পরিচর্যা করতে হয়। চারার বয়স ৩০-৩৫ দিন হলে বা চারা ১০-১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলে জমিতে রোপণের উপযোগী হয়। চারা তৈরির সময় রোগবালাইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হয়, যেমন রোভরাল ব্যবহার এবং চারা পরিচ্ছন্ন রাখা। সঠিকভাবে প্রস্তুত পেঁয়াজ চারা ভালো ফলন এবং রোগমুক্ত ফসলের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

চারা রোপণ

জমি চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করে আগাছা পরিষ্কার করতে হয় এবং প্রয়োজনীয় সার, যেমন গোবর সার, ইউরিয়া, টিএসপি ও পটাশ সমানভাবে প্রয়োগ করতে হয়। চারা রোপণের জন্য ১৫-২০ সেন্টিমিটার উঁচু এবং ১ মিটার প্রশস্ত বেড তৈরি করা হয়, যার মধ্যে সঠিকভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। চারা রোপণের দূরত্ব সারি থেকে সারি ১৫-২০ সেন্টিমিটার এবং চারা থেকে চারা ১০ সেন্টিমিটার রাখা হয়। রোপণের সময় চারা মাটিতে সোজা স্থাপন করে গোড়া হালকা মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। রোপণের পর হালকা সেচ দিতে হয়, যাতে চারা মাটির সঙ্গে ভালোভাবে সংযুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে সঠিক সেচ, আগাছা পরিষ্কার এবং সার প্রয়োগ করা। চারা রোপণের সময় যত্নশীলতা বজায় রাখা হলে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কমে এবং পেঁয়াজের ভালো ফলন নিশ্চিত হয়।

সার ব্যবস্থাপনা

পেঁয়াজের জন্য জমি প্রস্তুতের সময় জৈব সার, যেমন পচা গোবর বা কম্পোস্ট, ৮-১০ টন/হেক্টর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হয়। এছাড়া রাসায়নিক সারের মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি, এবং পটাশ সার নির্দিষ্ট পরিমাণে প্রয়োগ করা হয়। সাধারণত প্রতি হেক্টরে ইউরিয়া ২৪০ কেজি, টিএসপি  ২৬০ কেজি, এমওপি  ১৫০ কেজি, জিপসাম ১৫০ কেজি, জিপসাম ১০ কেজি জিংক সালফেট সার প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়।

টিএসপি এবং পটাশ সার জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করা হয়, আর ইউরিয়া সার তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হয়। প্রথম কিস্তি চারা রোপণের ১৫ দিন পর, দ্বিতীয় কিস্তি রোপণের ৩০ দিন পর, এবং তৃতীয় কিস্তি রোপণের ৫০ দিন পর দেওয়া হয়। সার প্রয়োগের সময় জমিতে পর্যাপ্ত সেচ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে গাছ প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করতে পারে। পেঁয়াজের ফলন বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত সালফার প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কন্দের গঠন এবং স্বাদ উন্নত করতে সহায়তা করে। সারের সঠিক প্রয়োগ পেঁয়াজের বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং গুণগত মান উন্নত করতে সহায়ক।

সেচ আগাছা ব্যবস্থাপনা

পেঁয়াজ চাষে সঠিক সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনা ফসলের ভালো বৃদ্ধি ও উচ্চ ফলন নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেঁয়াজের কন্দ মাটির নীচে গঠিত হওয়ায় মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় রাখা অপরিহার্য। চারা রোপণের পরপরই প্রথম সেচ দিতে হয় এবং এরপর মাটির রুক্ষতা অনুযায়ী প্রতি ৭-১০ দিন অন্তর সেচ দিতে হয়। কন্দ গঠনের সময় পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা হলে পেঁয়াজের আকার ও গুণগত মান ভালো হয়। তবে অতিরিক্ত সেচ দিলে কন্দ পচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই সেচের পর মাটি থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

আগাছা পেঁয়াজ গাছের পুষ্টি গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর প্রথম দফা আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। পরবর্তী সময়ে ১৫ দিন অন্তর অন্তর জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। মাটির উপরিভাগ আলগা করার জন্য হালকা নিড়ানি দেওয়া উচিত, যা গাছের শিকড়ের অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়। আগাছা ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন অনুযায়ী মালচিং বা আগাছানাশকও ব্যবহার করা যেতে পারে। সঠিক সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনা পেঁয়াজ গাছের স্বাস্থ্য ও ফলন বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।

রোগ পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা

২। স্টেমফাইলিয়াম লিফ ব্লাইট (Stemphylium leaf blight)

রোগের কারণ : Stemphylium sp. নামক ছত্রাক আক্রমণে এ রোগ হয়।

রোগের লক্ষণ :

প্রথমে পাতা ও পাতার কিনারায় ছোট ছোট পানিযুক্ত বাদামি বা হালকা হলুদ রঙের দাগ সৃষ্টি হয়। দাগগুলি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে বড় দাগে পরিণত হয় এবং পাতার গুটিয়ে ফেলা দেখা যায়। দাগের মধ্যবর্তী অংশ প্রথমে পাতলা ও পরবর্তীতে কালচে বর্ণ ধারণ করে। আক্রান্ত অংশ উপরের দিক হতে ক্রমশ নিচের দিকে মরে যেতে থাকে এবং পাতার উপরিভাগ থেকে খসে পড়ে। বীজদণ্ড আক্রান্ত হলে বীজ উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ রোগের আক্রমণের ফলে বীজ অনুপযোগী হয় এবং ফলন কমে যায়।

প্রতিকার

সুস্থ, রোগমুক্ত বীজ ও চারা ব্যবহার করতে হবে ও আক্রান্ত গাছের অবশিষ্ট অংশ সংগ্রহ করে ক্ষেতের বাইরে ধ্বংস করতে হবে। রোভরাল বা প্রোভ্যাক্স নামক ছত্রাকনাশক প্রতি কেজি বীজের সাথে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম ম্যানকোজেব / ২ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ / ২ গ্রাম রোভরাল মিশিয়ে ১০–১২ দিন পর পর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে। বীজ পেঁয়াজের ক্ষেত্রে কপার অক্সিক্লোরাইড ২ গ্রাম / ডাইথেন এম-৪৫ ২ গ্রাম / রোভরাল ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর ৪-৫ বার স্প্রে করতে হবে।

৩। গোড়া পচা (Bulb Rot)

রোগের কারণ : Sclerotium rolfsii / ফিউজারিয়াম (Fusarium sp.) / বট্রাইটিস (Botrytis sp.) নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

প্রতিকার

সুস্থ ও রোগমুক্ত বীজ ও চারা রোপণ করতে হবে। আক্রান্ত গাছ সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। জমিতে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ভালো রাখতে হবে। রোগ দেখা দিলে থাইওফেনেট মিথাইল / কার্বেন্ডাজিম / রোভরাল প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম মিশিয়ে গাছে স্প্রে করতে হবে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার।

৪। থ্রিপস দমন ব্যবস্থা

আক্রান্ত পাতা ছাঁটাই (প্রতি হেক্টরে ৪০টি) ব্যবহার করে পাতা নিয়ন্ত্রণ করা। আগা ভাঙা বীজ (৫০০ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে) শোধন করে বীজ শোধন করতে হবে। জমিতে সুষম সার প্রয়োগ ও পর্যাপ্ত সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে রোভরাল (আইপ্রোডিয়ন) ২ গ্রাম / লিটার অথবা ডাইথেন এম-৪৫ (ম্যানকোজেব) ২ গ্রাম / লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর এবং তারপর ১০-১৫ দিন অন্তর প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম ওষুধ মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

৫। এফিড বা জাব পোকা দমন ব্যবস্থা

আক্রান্ত পাতা ছাঁটাই (প্রতি হেক্টরে ৪০টি) ব্যবহার করতে হবে। আগাম তাপা নিম তেল (৫০ মি.লি. প্রতি লিটার পানিতে ১৪ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে) নিয়মিত ব্যবহার করতে হবে। বালাইনাশক ব্যবহার: ইমিডাক্লোপ্রিড ০.৫ মি.লি. / লিটার অথবা থায়ামেথক্সাম ০.২৫ গ্রাম / লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। প্রয়োজনে কনফিডর ৭০ ডব্লিউপি (ইমিডাক্লোপ্রিড) ১০ গ্রাম / ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

ফসল সংগ্রহ

পেঁয়াজ ফসল সংগ্রহ সঠিক সময়ে করলে ফলনের গুণগত মান এবং সংরক্ষণ ক্ষমতা ভালো থাকে। সাধারণত রোপণের ৯০-১২০ দিন পর পেঁয়াজ সংগ্রহের উপযোগী হয়, যখন পাতা হলদে হয়ে শুকিয়ে মাটির দিকে নুয়ে পড়ে। কন্দ পুরোপুরি পাকা নিশ্চিত করতে জমির সেচ বন্ধ রাখতে হয়। সংগ্রহের সময় গাছ সাবধানে তুলে মাটি ঝেড়ে কন্দ সংগ্রহ করা হয়। সংগ্রহের পর পেঁয়াজ ২-৩ দিন রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণের জন্য প্রস্তুত করা হয়। শুকানো হলে কন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সংরক্ষণ সহজ হয়। সঠিক সময়ে এবং পদ্ধতিতে ফসল সংগ্রহ করলে বাজারজাতকরণে ভালো মূল্য পাওয়া সম্ভব।

উপসংহার

সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পেঁয়াজ চাষ বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক কৃষি উদ্যোগে পরিণত হতে পারে। উন্নত জাত নির্বাচন, মাটির উপযোগিতা যাচাই এবং আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ ফসলের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি সুষম সার ব্যবস্থাপনা, সময়োপযোগী সেচ, রোগ ও পোকামাকড়ের সমন্বিত দমন এবং সঠিক সময়ে ফসল সংগ্রহ পেঁয়াজ চাষের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। তবে এসব আধুনিক পদ্ধতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য কৃষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, উন্নত প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং কৃষি সম্প্রসারণ সেবার সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকদের আগ্রহ ও বিনিয়োগ বাড়বে, বাজারের চাহিদা পূরণ হবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিখাতের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

লেখকঃপরিচালক(জনশক্তি ও প্রশিক্ষণ), বিএআরসি, ঢাকা।