এগ্রিলাইফ২৪ ডটকম: বাংলাদেশের কৃষিখাতকে আরও আধুনিক, লাভজনক ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে “জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: বাংলাদেশে কৃষির টেকসই উন্নয়ন” শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির আয়োজনে মঙ্গলবার (১৯ মে) দুপুর ২টায় ঢাকার ফার্মগেটে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী জনাব মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জনাব মোঃ আব্দুল বারী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জনাব সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জনাব মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এমপি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি-এর সভাপতি ও বিশিষ্ট কৃষি উদ্যোক্তা জনাব মোঃ আহসানুজ্জামান মিল্টু। সেমিনারের স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক জনাব মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম সিকদার।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রফেসর গোলাম হাফিজ কেনেডি, সদস্য, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) এবং প্রফেসর ড. মোঃ ওয়াকিলুর রহমান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
সেমিনারে কৃষি বাজেট, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি উন্নয়ন নিয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় বাস্তবভিত্তিক ও গবেষণানির্ভর বাজেট প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি।
অনুষ্ঠানে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে সময়োপযোগী ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
স্বাগত বক্তব্যে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয় যে, বর্তমান সরকার গত এপ্রিল মাসে “কৃষি জমি সুরক্ষা আইন ২০২৬” নামে একটি যুগান্তকারী আইন পাস করেছে, যা বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যতের জন্য এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের ফলে কৃষিজমি হ্রাস পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ আইনকে সময়োপযোগী ও দূরদর্শী উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
বক্তারা বলেন, শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; এর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য আগামী জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিজমির ডিজিটাল ম্যাপিং, মনিটরিং ব্যবস্থা, অবৈধ রূপান্তর প্রতিরোধ, স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃষক সহায়তা ও জনসচেতনতা কার্যক্রমে শক্তিশালী বাজেট বরাদ্দের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সেমিনারে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হবে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাত। কারণ এই খাত শুধু খাদ্য উৎপাদনই করে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, খাদ্য সংকট, বৈশ্বিক বাজার অস্থিরতা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খাদ্য নিরাপত্তা একটি কৌশলগত জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে বলে বক্তারা উল্লেখ করেন। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৃষিকে শুধু উৎপাদনমুখী নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর, জলবায়ু সহিষ্ণু, গবেষণাভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী করে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়।
সেমিনারে প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন নিয়েও বিশেষ আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, স্থানীয় গবাদিপশুর জাত যেমন নর্থ বেঙ্গল গ্রে (NBG), পাবনা, রেড চিটাগাং, মিরকাদিম ও হিল ব্ল্যাক শুধু প্রাণিসম্পদ নয়; এগুলো দেশের ঐতিহ্য, মূল্যবান জিনগত সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই কৃষি ও প্রাণিসম্পদকে সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামোর আওতায় এনে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
এছাড়া গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়ন, কৃষি বীমা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, জলবায়ু অভিযোজন এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের কৃষি ও এগ্রি-বিজনেসে সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তবমুখী বাজেট, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা এবং আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা একসাথে কাজ করলে বাংলাদেশ শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই থাকবে না; বরং কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদভিত্তিক রপ্তানি অর্থনীতিতেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
সেমিনারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নীতিনির্ধারক এবং উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মূল্যবান মতামত ও বিশ্লেষণ বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ভাবনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বক্তারা শেষে বলেন, কৃষি শুধু একটি পেশা নয়; এটি একটি জাতির অস্তিত্বের ভিত্তি। কৃষিজমি শুধু মাটি নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।


