বাসযোগ্য বাংলাদেশ: নদী–খাল–জলাশয়ের মুক্তি চাই

অঞ্জন মজুমদারঃবাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চলের একটি দেশ, যার জন্মই হয়েছে নদী ও পলিমাটির উপর ভিত্তি করে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীব্যবস্থার মিলনে গড়ে ওঠা এই ভূখণ্ডে হাজার হাজার নদী, খাল, বিল, হাওর ও জলাভূমি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের জীবন, কৃষি, মৎস্য, পরিবহন এবং পরিবেশের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। বাংলার সভ্যতা, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি নদীকেন্দ্রিক; একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি জনপদ নদী বা খালের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং এই জলপথই ছিল যোগাযোগ ও বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম কিন্তু গত কয়েক দশকে অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্প দূষণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে দেশের নদী–খাল–জলাশয় দ্রুত সংকুচিত হয়ে পড়ছে।ফলে একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাকৃতিক জলব্যবস্থার ধ্বংস।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে একসময় প্রায় ১,৩০০ নদীর অস্তিত্ব ছিল। বর্তমানে সক্রিয় নদীর সংখ্যা প্রায় ৯৩১টি হলেও এর মধ্যে প্রায় ৩০৮টি নদী নাব্যতা হারিয়েছে এবং অনেক নদী কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। গবেষণা বলছে, গত প্রায় পাঁচ শতকে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ নদী সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। স্বাধীনতার সময় দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৪,১৪০ কিলোমিটার,যা বর্তমানে শুকনো মৌসুমে প্রায় ৩,৮০০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে অর্থাৎ নদী ও জলপথের বিশাল একটি অংশ হারিয়ে গেছে বা ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে গত অর্ধশতকে প্রায় ৮,০০০ খাল বিলুপ্ত বা সংকুচিত হয়েছে।
প্রকৃতি বিনাশী ভয়াবহ পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার উপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। নদী–খাল–জলাশয়ের সংকট সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় রাজধানী ঢাকায়; একসময় ঢাকার চারপাশে অসংখ্য নদী ও খাল ছিল,যা শহরের প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করত।গবেষণা অনুযায়ী গত প্রায় ৮০ বছরে ঢাকায় প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল হারিয়ে গেছে এবং প্রায় ৩০৭ হেক্টর খাল এলাকা বিলুপ্ত হয়েছে। ১৯৪০ সালের আগের জরিপে ঢাকায় ৫৬৫ হেক্টর জলপথ ও খাল ছিল, যার প্রায় ৫৫ শতাংশ এখন আর নেই। হারিয়ে যাওয়া খালের বড় অংশ এখন ভবন, রাস্তা বা কৃষিজমিতে অথবা শিল্প কারখানায় পরিণত হয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, অবৈধ দখল এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে ঢাকার প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

জলাভূমি হারানোর প্রবণতা শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়; সারা দেশেই প্রাকৃতিক জলাশয়ের মৃত্যু ঘটা একটি গুরুতর সমস্যা।একটি গবেষণায় দেখা গেছে,২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় প্রায় ২৩ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছর প্রায় ২ শতাংশ জলাভূমি অবৈধভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে। একসময় এসব জলাভূমি বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ধারণ করে বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ করত কিন্তু এগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় শহরের পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বেড়েছে। অন্যদিকে নদী ও খাল হারিয়ে যাওয়ার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।

গ্রামাঞ্চলেও জলাশয় হারানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক- একসময় প্রায় প্রতিটি গ্রামে পুকুর, বিল ও খাল ছিল, যা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক মাছ উৎপাদন এবং কৃষি সেচের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। বর্তমানে অনেক জায়গায় এসব জলাশয় ভরাট করে বসতি বা কৃষিজমি অথবা শিল্প কারখানা তৈরি করা হচ্ছে।ঢাকাসহ বড় শহরের আশপাশে প্রতি বছর হাজার হাজার একর জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষণা অনুযায়ী শুধু বড় নগরগুলোর লাগোয়া অঞ্চলে প্রতি বছর প্রায় ৫,০০০ একর জলাভূমি বিলীন হচ্ছে এবং সারাদেশে গড়ে প্রায় ৪২,০০০ একর জলাধার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাটের এমন প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে দেশের বড় অংশ জলাশয় সংকটে পড়তে পারে, যা প্রাণ–প্রকৃতি ও কৃষির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে।

নদী–খাল–জলাশয়ের ধ্বংস বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য ও খাদ্য নিরাপত্তার উপরও গুরুতর প্রভাব ফেলছে। দেশের অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদনের বড় অংশ আসে নদী, বিল, হাওর ও খাল থেকে। এসব জলাশয় সংকুচিত হলে মাছের উৎপাদন কমে যায় এবং লক্ষ মৎস্যজীবী জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে, একই সঙ্গে খাল ও জলাভূমি কমে গেলে কৃষিক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সেচব্যবস্থা (সারফেস ওয়াটার) দুর্বল হয়ে পড়ে। নদী ও জলাভূমি প্রাকৃতিকভাবে বন্যার পানি ধারণ করে এবং অতিরিক্ত পানি ধীরে ধীরে নদীতে প্রবাহিত করে কিন্তু জলাশয় ভরাট হয়ে গেলে বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং খরার ঝুঁকি একসঙ্গে বেড়ে যায়- জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এই সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

নদী–খাল–জলাশয়ের ধ্বংসের সামাজিক প্রভাবও গভীর; একসময় নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জেলে সম্প্রদায়, নৌকার মাঝি, খালভিত্তিক সেচনির্ভর কৃষক এবং নদীপাড়ের ছোট ব্যবসায়ীরা তাদের জীবিকা হারাচ্ছেন। অনেক মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছেন,ফলে শহরে জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে এবং নগর পরিবেশ আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। নদী ও জলাশয় ধ্বংস হওয়া মানে কেবল প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি নয়; বরং একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থার ভাঙন। যেখানে হাজার বছর ধরে বৃক্ষ, গাছপালা, বন্য প্রাণী, পাখি, জলজ প্রাণী এবং মানুষের জীবিকা ও সংস্কৃতি জলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল, সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য আজ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে নদী–খাল–জলাশয় পুনরুদ্ধারকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত; দেশের সব নদী, খাল, বিল ও জলাভূমির একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা জরুরি, যাতে কোনো জলাশয় দখল বা ভরাট করা হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা যায়। দ্বিতীয়ত; নদী ও খাল দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রভাবশালী মহলের দখলদারিত্ব বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত; মৃতপ্রায় নদী ও খাল পুনঃখননের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে।

শহর পরিকল্পনায় নদী ও জলাভূমিকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত জলব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলাশয়কে বাধা নয় বরং সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নতুন নগর পরিকল্পনায় পর্যাপ্ত খাল, জলাধার ও জলাভূমি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

নদী ও জলাশয় রক্ষায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কৃষক, মৎস্যজীবী, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে নদী ও খাল সংরক্ষণ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। স্কুল–কলেজ পর্যায়েও জলাশয় সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। নদী ও জলাশয় রক্ষা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলার সামাজিক আন্দোলনও বটে ।

আগামী ১৬ মার্চ ২০২৬ দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার শাহাপাড়া খাল পুনঃখননের মাধ্যমে দেশব্যাপী খাল খনন ও জলাধার পুনরুদ্ধার কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দেশের নদী–খাল–জলাশয় পুনরুদ্ধার করে সেচব্যবস্থা উন্নত করা, জলাবদ্ধতা কমানো, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী কয়েক বছরে সারাদেশে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হবে, যাতে পানি সংরক্ষণ, কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হয় এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ তার প্রত্যক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে, বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী ও ভিশনারী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসাবে জাতীয়ভাবে একটি দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপের হারিয়ে যাওয়া নদী, খাল ও জলাশয়ের মুক্তি নিশ্চিত করা এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলা ।