সমীরণ বিশ্বাস:বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো কৃষি। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কৃষিখাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।
যদিও শিল্প ও সেবা খাতের সম্প্রসারণের ফলে জিডিপিতে কৃষির শতকরা অবদান তুলনামূলকভাবে কমেছে, তবুও দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, খাদ্য সরবরাহ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই জাতীয় বাজেটে কৃষির অবস্থান শুধু একটি অর্থনৈতিক খাতের বরাদ্দ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি কৌশলগত বিষয়।
বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় কৃষির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বৈশ্বিক যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী কৃষি বাজেট দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই কৃষিকে শুধু উৎপাদন খাত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
জাতীয় বাজেটে কৃষির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, অন্যদিকে আবাদযোগ্য জমি কমে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে উন্নত বীজ, সার, সেচ, কৃষিযন্ত্র এবং প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ অত্যন্ত জরুরি। সরকার কৃষকদের ভর্তুকি, প্রণোদনা এবং বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করলে উৎপাদন খরচ কমে এবং কৃষক উৎপাদনে উৎসাহিত হন। ফলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকার পাশাপাশি সংকটকালেও জনগণের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়।
কৃষক কার্ড কার্যক্রম
বাংলাদেশ সরকারের কৃষক কার্ড কার্যক্রম কৃষি সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করেছে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যার ফলে ভর্তুকি, প্রণোদনা, বীজ, সার এবং কৃষিঋণ সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়েছে। জাতীয় বাজেটে কৃষক কার্ড ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল ও তথ্যভিত্তিক করার জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থাপনায় কৃষক ডাটাবেজ, মোবাইলভিত্তিক পরামর্শ এবং ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে সহায়তা করবে।
কৃষকদের সহায়তা ও ভর্তুকি
কৃষকরা নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন। কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কখনো বাজারে মূল্যপতন, আবার কখনো উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি কৃষকদের ক্ষতির মুখে ফেলে। তাই জাতীয় বাজেটে কৃষি ভর্তুকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সার, ডিজেল, বিদ্যুৎ এবং কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, বীজ সহায়তা এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি কৃষি উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু কৃষি। কৃষকের আয় বাড়লে স্থানীয় বাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন এবং অন্যান্য সেবাখাতও সক্রিয় হয়। ফলে কৃষিতে বিনিয়োগ শুধু কৃষকের উন্নয়ন নয়; এটি পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখে। জাতীয় বাজেটে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তা উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ালে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং শহরমুখী চাপ কমবে।
কৃষি প্রযুক্তি ও আধুনিকায়ন
বর্তমান সময়ে টেকসই কৃষি উৎপাদনের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। উন্নত দেশগুলো ড্রোন, সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট সেচ এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করছে। বাংলাদেশেও কৃষি আধুনিকায়নের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, স্মার্ট সয়েল সেন্সর, আবহাওয়াভিত্তিক পরামর্শ এবং ডিজিটাল কৃষি প্ল্যাটফর্ম কৃষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করতে পারে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি উদ্ভাবকদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করে প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
খাল খনন, সেচ ও কৃষি ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশে কৃষি অনেকাংশে পানির ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি কৃষিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই জাতীয় বাজেটে খাল খনন, জলাধার সংরক্ষণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। অনেক এলাকায় নদী ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃষিতে পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। পরিকল্পিত খাল পুনঃখনন এবং আধুনিক সেচব্যবস্থা কৃষি উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম দেশ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। তাই কৃষি বাজেটে জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। লবণাক্ততা সহনশীল ধান, খরাসহিষ্ণু ফসল, ভাসমান কৃষি এবং জলবায়ু অভিযোজন প্রযুক্তির জন্য গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের জলবায়ু ঝুঁকি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করাও প্রয়োজন।
কৃষিপণ্য রপ্তানি ও বৈদেশিক আয়
বাংলাদেশের কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। সবজি, ফল, চা, পাট, মসলা এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মান, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে রপ্তানির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। জাতীয় বাজেটে কোল্ড স্টোরেজ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি সহায়তায় বরাদ্দ বাড়ালে কৃষিপণ্য রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ
বাংলাদেশের অনেক শিল্প কৃষির ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য শিল্প, পাট শিল্প, চিনি শিল্প, বস্ত্রশিল্প এবং দুগ্ধশিল্পের প্রধান কাঁচামাল আসে কৃষিখাত থেকে। কৃষি উৎপাদন বাড়লে শিল্পখাতও শক্তিশালী হয়। তাই শিল্পায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কৃষিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন। কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা
কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামাজিক বৈষম্য কমাতে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনেও কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবেশবান্ধব কৃষি, জৈব সার ব্যবহার এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সহজ শর্তে ঋণ ও ক্রপ ইন্সুরেন্স
বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। অনেক কৃষকের পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় তারা উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং কৃষক আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েন। তাই সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণ জরুরি। একই সঙ্গে ফসলের ক্ষতি থেকে কৃষককে সুরক্ষা দিতে ক্রপ ইন্সুরেন্স বা শস্য বীমা চালু ও সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক দ্রুত পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেলে কৃষি উৎপাদন ধারাবাহিক থাকবে।
প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও নতুন জাত উদ্ভাবন
কৃষির উন্নয়নে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য গবেষণা সংস্থা নতুন জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে গবেষণায় পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের অভাব অনেক সময় উন্নয়নকে ধীর করে দেয়। উচ্চ ফলনশীল, রোগপ্রতিরোধী এবং জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ, মাটি ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দিলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
বাস্তব চিত্র ও চ্যালেঞ্জ
যদিও জাতীয় বাজেটে কৃষির জন্য প্রতিবছর বরাদ্দ দেওয়া হয়, বাস্তবে অনেক কৃষক কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্যের অভাব, ভেজাল সার-বীজ এবং সংরক্ষণ সংকট কৃষকদের বড় সমস্যা। অনেক সময় বাজেট ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের সমন্বয় থাকে না। ফলে কৃষক প্রত্যাশিত সুফল পান না। তাই শুধু বাজেটের আকার বৃদ্ধি নয়; বরং সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।
এই বাস্তবতায় জাতীয় বাজেটে কৃষিখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি। কৃষি শুধু একটি উৎপাদন খাত নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। বৈশ্বিক যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সময়েও একটি শক্তিশালী কৃষি বাজেট দেশকে সংকট মোকাবিলায় সক্ষম করে।
তাই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি উদ্ভাবকদের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কৃষকবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সময়োপযোগী বাজেট শুধু খাদ্য উৎপাদনই বাড়াবে না; বরং দারিদ্র্য হ্রাস, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথও সুদৃঢ় করবে। বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে কৃষির গুরুত্ব তাই কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কৌশলগত ভিত্তি।
-লেখক: কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।


