ডিমের বাজারের দ্বৈত প্রবণতাঃ পুরো পোলট্রি উৎপাদন ব্যবস্থাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে

অঞ্জন মজুমদারঃবাংলাদেশে ডিম ও মুরগি দেশের সস্তা প্রোটিনের প্রধান উৎস কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিমের বাজারে এক অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন খরচের নিচে দাম আবার হঠাৎ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি; এই দ্বৈত প্রবণতা শুধু বাজারের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করছে না বরং পুরো পোলট্রি উৎপাদন ব্যবস্থাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এর ফলে একদিকে প্রান্তিক খামারিরা দেউলিয়া হচ্ছেন, অন্যদিকে ভোক্তারা মূল্য অস্থিরতার কারণে চরম অনিশ্চয়তায় ভূগেন।

প্রথমত, দীর্ঘ সময় ধরে ডিমের দাম উৎপাদন খরচের নিচে থাকায় খামারিরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, খামার পর্যায়ে ডিমের উৎপাদন খরচ প্রায় ১০–১০.৫ টাকা হলেও অনেক সময় তা ৬–৭ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে । ফলে প্রতিটি ডিমে ৩–৪ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই ধারাবাহিক ক্ষতির কারণে হাজার হাজার ছোট ও প্রান্তিক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

দ্বিতীয়ত, উৎপাদন ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। পোলট্রি ফিড, ওষুধ, জ্বালানি এবং পরিবহন খরচ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে । অনেক ক্ষেত্রে ফিডের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে কিন্তু বাজারে সেই অনুপাতে দাম না বাড়ায় খামারিরা টিকে থাকতে পারছেন না।

তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এই অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ। বাজারে সরাসরি খামার থেকে ভোক্তার কাছে সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীরা বড় ভূমিকা রাখে। অনেক ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট বা করপোরেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে, যা দামকে কৃত্রিমভাবে বাড়ানো বা কমানোর মাধ্যমে বাজারকে অস্থিতিশীল করে । ফলে খামারিরা ন্যায্য দাম পান না, অথচ ভোক্তারা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন।

চতুর্থত, ডিমের বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের হঠাৎ পরিবর্তন বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। যখন খামারিরা ক্ষতির কারণে উৎপাদন কমিয়ে দেন, তখন কিছুদিন পর সরবরাহ সংকট তৈরি হয় এবং হঠাৎ দাম বেড়ে যায়। আবার কোনো কারণে উৎপাদন বেশি হলে বা চাহিদা কমে গেলে দাম পড়ে যায়। যেমন, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি বা মৌসুমি পরিবর্তনের কারণে একসময় ডিমের দাম বেড়ে ১২ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল, পরে দ্রুত কমেও গেছে, এই “boom and bust” চক্রই মূলত বাজারকে অস্বাভাবিক করে তুলছে।

পঞ্চমত, এই অস্থিতিশীলতা ভোক্তাদের জন্যও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ডিম একটি সহজলভ্য প্রোটিন উৎস হলেও হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির কারণে তা অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আবার দাম কমলে খামারিরা উৎপাদন কমিয়ে দেন, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি করে। ফলে ভোক্তা ও উৎপাদক উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

চ্যালেঞ্জসমূহ
বাংলাদেশের পোলট্রি খাত বর্তমানে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—
১. উৎপাদন খরচ ও বাজার দামের মধ্যে অসামঞ্জস্য
প্রান্তিক খামারিদের টিকে থাকার সংকট।
২. বাজারে সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য
নীতিনির্ধারণ ও তদারকির দুর্বলতা।
৩.উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা
এই চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান না করলে ভবিষ্যতে দেশ একটি বড় প্রোটিন সংকটের মুখে পড়তে পারে।

সম্ভাব্য সমাধান:
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ জরুরি।

প্রথমত, ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে একটি “floor price” নির্ধারণ করে তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, যাতে খামারিরা কমপক্ষে একটি নির্দিষ্ট লাভ পান।

দ্বিতীয়ত, খামার থেকে বাজারে সরাসরি সরবরাহ চেইন গড়ে তুলতে হবে। সমবায় ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা চালু করলে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কমবে এবং খামারিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন।

তৃতীয়ত, ফিড ও ইনপুট খরচ কমাতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। ভর্তুকি, কর কমানো এবং স্থানীয়ভাবে ফিড উৎপাদন বাড়ানো গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব।

চতুর্থত, ডেটা-ভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা জরুরি। কত উৎপাদন প্রয়োজন, কোথায় ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত—এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করলে অতিরিক্ত উৎপাদন বা ঘাটতি কমানো যাবে।

পঞ্চমত, বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। সিন্ডিকেট বা কারসাজি রোধে নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ অপরিহার্য।

ষষ্ঠত, প্রান্তিক খামারিদের জন্য সহজ ঋণ ও বীমা ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যাতে তারা ক্ষতির সময় টিকে থাকতে পারেন।

ডিমের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি কম দাম এবং হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি—এই দুই বিপরীতমুখী প্রবণতা আসলে একটি অস্বাস্থ্যকর বাজার ব্যবস্থার লক্ষণ। এটি কেবল খামারিদের ধ্বংস করছে না বরং দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

তাই এখনই সময় একটি সমন্বিত নীতি গ্রহণের যেখানে উৎপাদক, ভোক্তা এবং বাজার তিন পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা হবে। অন্যথায়, পোলট্রি খাতের এই সংকট ভবিষ্যতে একটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে।

লেখক:পোল্ট্রি প্রোডাকশন এন্ড সাপ্লাই চেইন স্পেশালিষ্ট