
এন্টিবায়োটিকমুক্ত, কস্টিং সেভ ও নিরাপদ মৎস্যফিড: মিরিস্টিক এসিডে পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও লাভজনকতার নতুন দিগন্ত
এগ্রিলাইফ প্রতিবেদক: নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং টেকসই মৎস্যচাষএই তিনটি লক্ষ্য একসাথে অর্জনের জন্য বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এন্টিবায়োটিকমুক্ত ফিশ ফিডের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে পুষ্টিবিদ সাইফি নাসিরের গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে মিরিস্টিক এসিড (Myristic Acid, C14:0)-এর অসাধারণ সম্ভাবনা, যা একদিকে মাছের স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধি নিশ্চিত করে, অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের জন্য কস্টিং সেভিং ও লাভজনক উৎপাদনের পথ খুলে দেয়।
পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির জানান, মিরিস্টিক এসিড একটি স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড (SFA), যা প্রাকৃতিকভাবে মাছের তেল ও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ তেলে (নারকেল তেল, পাম তেল, মাখন ইত্যাদি) পাওয়া যায়। মাছের টিস্যুতে এটি সাধারণত মোট ফ্যাটি এসিডের একটি ছোট অংশ হলেও শক্তির উৎস, কোষের গঠন এবং সামগ্রিক ফ্যাটি এসিড ভারসাম্য রক্ষায় এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরিহার্য ফ্যাটি এসিড যেমন EPA ও DHA যেখানে বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য, সেখানে মিরিস্টিক এসিড শক্তি ব্যবস্থাপনা ও কোষীয় কার্যক্রমে সহায়ক হয়ে মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখে।
পুষ্টিবিদ সাইফি নাসিরের মতে, মিরিস্টিক এসিড প্রোটিন মাইরিস্টয়লেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোষের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত অণু তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এর ফলে কোষের কার্যকারিতা, প্রোটিনের সঠিক অবস্থান নির্ধারণ এবং মাছের সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত হয়। যদিও এর মাত্রা প্রজাতি ও খাদ্যভেদে পরিবর্তিত হয়, তবুও সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করলে এটি মাছের মাংসের চূড়ান্ত ফ্যাটি এসিড প্রোফাইলকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
ফিড প্রক্রিয়াজাতকরণে স্থিতিশীলতার দিক থেকেও মিরিস্টিক এসিড একটি নিরাপদ উপাদান। থার্মোগ্র্যাভিমেট্রিক বিশ্লেষণ (TGA) অনুযায়ী, এটি প্রায় ১৮২° সেলসিয়াসে তাপীয় অবক্ষয় শুরু করে এবং ২৩৭° সেলসিয়াস পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকে। ফলে ভাসমান ফিশ ফিডের সাধারণ এক্সট্রুশন তাপমাত্রা (১০০–১৪০° সেলসিয়াস) এর মধ্যে এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও স্থিতিশীল থাকে। তবে PUFA-এর সাথে মিশ্রণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণ জরুরি, যাতে ক্ষতিকারক লিপিড অক্সিডেশন পণ্য তৈরি না হয় এবং সামগ্রিক পুষ্টিমান অক্ষুণ্ন থাকে বরে ঝানান পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মিরিস্টিক এসিড মাছের অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি অন্ত্রের পরিবেশ উন্নত করে, পুষ্টি শোষণ বাড়ায় এবং ওজন বৃদ্ধি ও ফিড কনভার্সন রেশিও (FCR) উন্নত করতে সহায়ক হয়। একই সঙ্গে এটি একটি কার্যকর ইমিউনোস্টিমুল্যান্ট হিসেবে কাজ করে লাইসোজাইম কার্যকলাপ ও শ্বাসযন্ত্রের বিস্ফোরণ বৃদ্ধি করে মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মিরিস্টিক এসিডের এন্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য। পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির উল্লেখ করেন, এটি ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীরের সাথে যুক্ত হয়ে ঝিল্লির ব্যাপ্তিযোগ্যতা পরিবর্তন করতে পারে এবং ক্লোস্ট্রিডিয়াম পারফ্রিনজেনস ও স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াসের মতো ক্ষতিকারক রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে মিরিস্টিক এসিড মাছের খাদ্যে একটি সম্ভাবনাময় এন্টিবায়োটিক বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমান সময়ে যখন ভোক্তারা এন্টিবায়োটিকমুক্ত মাছ ও মাছজাত পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন, তখন মিরিস্টিক এসিডভিত্তিক ফিড উদ্যোক্তাদের জন্য একটি কৌশলগত সমাধান। এটি শুধু মাছের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না, বরং ওষুধ ব্যয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কস্টিং সেভিং নিশ্চিত করে। ফলে উৎপাদন হয় নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও লাভজনক—যা টেকসই মৎস্যখাত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মত প্রকাশ করেন পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির।
সার্বিকভাবে বলা যায়, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য এন্টিবায়োটিকমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক বাস্তবতা বিবেচনায় কস্টিং সেভিং অত্যন্ত জরুরি। এই দুই দিকের সমন্বয়ে মিরিস্টিক এসিড একটি আধুনিক, গবেষণাভিত্তিক ও নিরাপদ পুষ্টি সমাধান হিসেবে মৎস্যখাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির।
























