কৃষকের স্বপ্নসাথী ড. একেএম জাকারিয়া

মিজানুর রহমান, বগুড়া:দূর থেকে দেখলে মনে হবে তপ্ত বালিয়াড়ি পেরিয়ে এক দুরন্ত যুবক এগিয়ে চলেছেন মাইলের পর মাইল। সামনে থেকে পথ দেখাচ্ছেন, সঙ্গে নিচ্ছেন নতুন প্রজন্মকে। অথচ তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন ২০১৮ সালে। কিন্তু কাজ থেকে অবসর নেননি এক দিনের জন্যও। কর্মই তার তারুণ্যের উৎস, আর মানুষের জন্য কাজ করাই তার জীবনের প্রধান অনুপ্রেরণা।

তিনি ড. একেএম জাকারিয়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, বগুড়ার সাবেক পরিচালক এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কৃষি বিজ্ঞানী। বগুড়া জেলার শাজাহানপুর উপজেলার এই কৃতি সন্তান আজ চরাঞ্চল উন্নয়ন, গ্রামীণ উদ্ভাবনী ও জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি প্রযুক্তির এক অনন্য নাম।

অবহেলিত মানুষের পাশে আজীবন
ড. জাকারিয়ার কর্মজীবনের অগ্রাধিকার ছিল সবসময় অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত ও হতদরিদ্র মানুষ। তাই তিনি বেছে নিয়েছেন দুর্গম চরাঞ্চল ও হাওড় অঞ্চলযেখানে উন্নয়নের আলো পৌঁছাতে সময় লাগে বেশি। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলায় তার নেতৃত্ব বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।

সরকারি দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার পরও তিনি মাঠেই সক্রিয়। সেমিনার বা টেলিভিশনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে চলেছেন নিরলসভাবে।

কৃষিতে বৈপ্লবিক অবদান
পেশাগত জীবনের শুরুতেই তার এক গবেষণা দেশের কৃষিখাতে বয়ে আনে বড় পরিবর্তন। উচ্চমূল্যের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে হাইব্রিড ভুট্টা বীজ উৎপাদনের টেকনিক্যাল প্রটোকল উদ্ভাবনের মাধ্যমে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে ভুট্টা চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় দেশে পোলট্রি ও ডেইরি শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন গতি দেয়।

তার এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে। এছাড়াও কৃষিখাতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন জাতীয় কৃষি পুরস্কার।

গ্রামীণ নারীর বীজ প্রযুক্তি ‘মারিয়া’ মডেল
বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের অন্যতম মৌলিক উপাদান বীজের ঘাটতি প্রায় ৭০ শতাংশ। এই ঘাটতির বড় অংশ পূরণ করে আসছেন গ্রামীণ নারীরা। তাদের এই ঐতিহাসিক অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে দীর্ঘ দুই দশকের গবেষণায় ড. জাকারিয়া উদ্ভাবন করেন গ্রামীণ নারীর বীজ প্রযুক্তি ‘মারিয়া’ মডেল। এই মডেল শুধু দেশে নয়, সার্কভুক্ত দেশসমূহ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ভাষান্তরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।

গণমাধ্যমে ‘ফসলের ডাক্তার’
জনপ্রিয় টিভি ম্যাগাজিন ইত্যাদি-তে কৃতিমান মানবিক মানুষদের তালিকায় স্থান পেয়েছে তার নাম। নন্দিত উপস্থাপক হানিফ সংকেত তাকে আখ্যা দিয়েছেন “ফসলের ডাক্তার” হিসেবে। বিটিভির কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠান মাটি ও মানুষ-এ তার গবেষণাকর্ম নিয়ে একাধিক পর্ব প্রচারিত হয়েছে। এছাড়া প্রথম আলো, দৈনিক কালের কণ্ঠ এবং The Daily Star-সহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে তার উদ্ভাবনী ও গবেষণাকর্ম কভার স্টোরি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।

চর উন্নয়ন গবেষণায় নতুন দিগন্ত
তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পল্লী উন্নয়ন একাডেমীতে প্রতিষ্ঠিত হয় চর উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্র (CDRC)। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্রের তিনি প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। অবসরের পর কেন্দ্রটির দায়িত্ব তুলে দেন তার যোগ্য উত্তরসূরি ড. মোঃ আব্দুল মজিদের হাতে। বর্তমানে তিনি এমিরেটাস সায়েন্টিস্ট হিসেবে পূর্ণোদ্যমে গবেষণায় নিয়োজিত আছেন। এই কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে প্রায়োগিক গবেষণা ভিত্তিক জার্নাল, ক্লাইমেট স্মার্ট ইনোভেশন বিষয়ক গ্রন্থ এবং চরাঞ্চল উপযোগী ২০টি প্রযুক্তি সংবলিত বই। ইতোমধ্যে কেন্দ্রটি দেশে-বিদেশে চর উন্নয়ন গবেষণার অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও প্রেরণা
লন্ডন থেকে International Communication Award-২০০৪, ভারত থেকে Flame Asia Award (Gold Medal), জাতীয় পল্লী উন্নয়ন পুরস্কার (গোল্ড মেডেল)সহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। তবে ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয় চরাঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নই তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি A. P. J. Abdul Kalam এক আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে তাকে লক্ষ্য করে মন্তব্য করেছিলেন—“His simplicity is his generous trademark; he can make farmers happy with nothing.”

শেষ নেই এই পথচলার
আজও তিনি মাঠে, মানুষের মাঝে। অনুজ সহকর্মীদের নিয়ে কাজ করে চলেছেন চরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে। কথার ফুলঝুরি নয়, বাস্তব কাজই তার পরিচয়।তাই বলা যায় ড. একেএম জাকারিয়া শুধু একজন কৃষি বিজ্ঞানী নন; তিনি বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের এক জীবন্ত কিংবদন্তী, যার গল্পের শেষ নেই।