
কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদারঃবাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সড়ক, সেতু, আবাসন, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা কৃষিভিত্তিক বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে অর্থনীতি সম্প্রসারিত হচ্ছে কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন এখন সময়ের দাবি: উন্নয়নের এই গতি কি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে?
গ্রীন সার্কুলার অর্থনীতির ধারণা আমাদের বার্তা দিচ্ছে , উন্নয়ন ও পরিবেশ একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়; বরং সঠিক পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে দুটিকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিতে হয় আর এই সমন্বয়ের প্রধান হাতিয়ার হলো; Environmental Impact Assessment (EIA) বা পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন।
EIA এমন একটি বৈজ্ঞানিক ও নীতিগত প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে তার সম্ভাব্য পরিবেশগত ও সামাজিক,অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। প্রকল্পের ফলে বায়ু, পানি, মাটি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবিকায় কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে তা আগেভাগেই চিহ্নিত করা EIA-এর উদ্দেশ্য।
উন্নয়ন যদি পরিবেশের ক্ষতি করে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করে, ফলে EIA কেবল পরিবেশ রক্ষার প্রক্রিয়া নয়, এটি টেকসই অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পূর্বশর্ত।
বাংলাদেশে EIA-এর আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭-এর মাধ্যমে। এসব আইনের আওতায় পরিবেশ অধিদপ্তর উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী শ্রেণিবদ্ধ করে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বা Red Category প্রকল্পের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ EIA বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, এই বিধান প্রকল্প অনুমোদনের আগে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ নিশ্চিত করে, যা পরিবেশগত ক্ষতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
EIA প্রক্রিয়ার শুরু হয় স্ক্রিনিং দিয়ে, যেখানে নির্ধারণ করা হয় প্রকল্পটির জন্য পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন কি না, এরপর স্কোপিং পর্যায়ে প্রকল্পের প্রভাবের পরিধি নির্ধারণ করা হয়—কোন এলাকা, কোন উপাদান এবং কোন সময়সীমা বিবেচনায় নেওয়া হবে। পানি, বায়ু, মাটি, শব্দ, জীববৈচিত্র্য এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বিষয়গুলো এখানে অগ্রাধিকার পায়। যথাযথ স্কোপ নির্ধারণ না হলে পুরো মূল্যায়নই দুর্বল হয়ে পড়ে।
বেসলাইন জরিপ হলো EIA-এর ভিত্তি। প্রকল্প শুরু হওয়ার আগে এলাকার বর্তমান পরিবেশগত অবস্থা বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করা হয়।বায়ু ও পানির গুণগত মান,মাটির বৈশিষ্ট্য, শব্দের মাত্রা, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎ,কৃষিকাজ, জনস্বাস্থ্য ও জীবিকা সব তথ্য সংগ্রহ করা হয়।ভবিষ্যতে কোনো পরিবর্তন ঘটলে এই বেসলাইন তথ্যের সঙ্গে তুলনা করেই প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
প্রভাব শনাক্তকরণ ও বিশ্লেষণ পর্যায়ে নির্মাণকালীন এবং পরিচালনাকালীন সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়।ধুলা ও শব্দ দূষণ, মাটি ক্ষয়, জলাবদ্ধতা, শিল্পবর্জ্য, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস কিংবা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এসব সম্ভাব্য প্রভাব আধুনিক প্রযুক্তি যেমন GIS ম্যাপিং, পরিবেশগত মডেলিং ও প্রভাব ম্যাট্রিক্সের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়, এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও তথ্যনির্ভর ও নির্ভুল হয়।
তবে শুধু সমস্যা চিহ্নিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, কার্যকর প্রশমন ব্যবস্থা গ্রহণই EIA-এর মূল সাফল্য। ধুলা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো, শব্দ কমাতে সাউন্ড ব্যারিয়ার ব্যবহার, বর্জ্য পানির জন্য ETP স্থাপন, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষনিধনের পরিবর্তে পুনঃবৃক্ষরোপণ এসব পদক্ষেপ বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তবায়ন করতে হয়। এ জন্য একটি সুসংহত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (EMP) প্রণয়ন জরুরি।
EIA প্রক্রিয়ায় জনসম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় কৃষক, জেলে, নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মতামত ছাড়া কোনো প্রকল্প বাস্তবসম্মত হয় না। উন্মুক্ত জনশুনানি প্রকল্পের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায় এবং সম্ভাব্য বিরোধ কমায়। উন্নয়ন মানুষের জন্য তাই মানুষের কণ্ঠস্বরই এখানে চূড়ান্ত বিবেচ্য। অনুমোদনের পর নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা না হলে EIA কেবল কাগুজে প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। নির্ধারিত সময় অন্তর বায়ু, পানি ও শব্দের মান যাচাই এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কঠোর তদারকি ও স্বচ্ছতা ছাড়া সবুজ অর্থনীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ন ও শিল্পায়নের চাপে পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলস্বরূপ বন্যা, নদীভাঙন, কৃষিজমি হ্রাস ও জনস্বাস্থ্য সংকট বাড়তে পারে। স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বরং সঠিকভাবে বাস্তবায়িত EIA উন্নয়নকে করে তোলে টেকসই, বিনিয়োগকে করে নিরাপদ এবং পরিবেশকে রাখে সুরক্ষিত।
সবুজ অর্থনীতির পথে এগোতে হলে EIA-কে আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাধ্যতামূলক পূর্বশর্ত হিসেবে দেখতে হবে।আজকের পরিকল্পনায় পরিবেশগত বিবেচনা অন্তর্ভুক্ত না করলে আগামী দিনের উন্নয়ন বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। অর্থনীতি,পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও সমাজ—এই তিনের সমন্বিত সুরক্ষাই টেকসই উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে EIA-ই আমাদের প্রধান দিকনির্দেশনা।
লেখক: পোল্ট্রি সাপ্লাই চেইন ও সার্কুলার ইকোনমি স্পেশালিস্ট
























