কৃষক খামারি; যাঁদের শ্রমে,ঘামে ও বিনিয়োগে সুরক্ষিত হয় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা

কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার:বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আমরা যখন আলোচনা করি, তখন প্রায়ই উৎপাদনের পরিমাণ, আমদানি-রপ্তানি কিংবা নীতিনির্ধারণী কৌশলের দিকে দৃষ্টিপাত করি কিন্তু এই বিশাল ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকা মানুষগুলো—কৃষক ও খামারি অনেক সময়ই আলোচনার প্রান্তে থেকে যান; অথচ তাঁদের শ্রম, ঘাম ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ ছাড়া দেশের খাদ্য ব্যবস্থার চাকা একদিনও সচল রাখা সম্ভব নয়- তাঁরা শুধু উৎপাদক নন,খাদ্য নিরাপত্তার মূল কারিগরও।

দেশের কৃষি ও লাইভস্টক খাত আজও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি, মোট কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদানও উল্লেখযোগ্য। ধান, সবজি, মাছ, দুধ, ডিম বা মাংস যে পণ্যই আমরা ভোক্তা হিসেবে গ্রহণ করি, তার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ উৎপাদন চক্র, যেখানে কৃষক-খামারিরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকি মোকাবিলা করে কাজ করেন।প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগবালাই, বাজারের অস্থিরতা সবকিছুর মাঝেই তাঁরা উৎপাদন চালিয়ে যান কিন্তু উৎপাদনের পর বাজারে গিয়ে সেই পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেলে তাঁদের এই পরিশ্রম অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হয় না।

বর্তমান বাস্তবতায় কৃষি উৎপাদনের খরচ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে; বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, পশুখাদ্য, শ্রম—সবকিছুর দাম বেড়েছে, অন্যদিকে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি কৃষিপণ্যের বিপণন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিপরীতে কৃষকরা অনেক সময় তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম পড়ে যায়, আবার ঘাটতি তৈরি হলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়লেও তার সুফল উৎপাদকরা পুরোপুরি পান না-  এমন বৈষম্যমূলক বাজার কাঠামো কৃষক-খামারিদের আর্থিক নিরাপত্তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

কৃষক খামারিদের উৎপাদন করা পন্যের লাভজনক বিক্রয়মূল্য নিশ্চিত করা শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়; কল্যান রাষ্ট্র ভাবনায়, এটি খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। কৃষি যদি লাভজনক না হয়, তাহলে নতুন প্রজন্ম এই খাতে আসবে না—যা ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্রোত বাড়ছে, যেখানে অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অবকাঠামোগত চাপ নতুন সংকট তৈরি করছে।বিপরীতে, গ্রামে উৎপাদনশীল জনশক্তির ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে এই প্রবণতা বদলানো সম্ভব; স্থিতিশীল ও লাভজনক আয়ের নিশ্চয়তা থাকলে তরুণরা কৃষিকে একটি সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে বিবেচনা করবে। ইতোমধ্যে দেশে কিছু উদাহরণ দেখা যাচ্ছে, যেখানে শিক্ষিত তরুণরা আধুনিক খামার স্থাপন, এগ্রি-স্টার্টআপ বা ডিজিটাল বিপণন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করছেন।তরুন উদ্যোক্তাদের এই প্রবণতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করা গেলে কৃষি খাতে নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি হবে।

তরুণদের সম্পৃক্ততা কৃষিতে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রসার ঘটাতে পারে; স্মার্ট ফার্মিং, আইওটি-ভিত্তিক সেচ ও মনিটরিং, ড্রোনের মাধ্যমে ফসল পর্যবেক্ষণ, জেনেটিক উন্নয়ন, বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা—এসব প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। লাইভস্টক খাতে উন্নত জাত, সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা, ভ্যাকসিনেশন ও রোগ নির্ণয়ের আধুনিক পদ্ধতি খামার ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করে তুলতে পারে, তবে এসব প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা তখনই বাড়বে, যখন উৎপাদকরা নিশ্চিত হবেন যে তাদের বিনিয়োগের যথাযথ প্রতিফলন তারা পাবেন।

বাজার ব্যবস্থার সংস্কার এখানে একটি কেন্দ্রীয় বিষয়; কৃষক-খামারিরা যাতে সরাসরি ভোক্তা বা খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারেন, সে জন্য ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং সমবায়ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। আধুনিক কোল্ড চেইন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা থাকলে কৃষকরা তাড়াহুড়ো করে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। একই সঙ্গে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ, বাজার তদারকি এবং তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে মূল্য ব্যবধান অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি না পায়।

কৃষি ও লাইভস্টক খাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি, বীমা সুবিধা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ এবং সম্প্রসারণ সেবা জোরদার করা গেলে উৎপাদকদের সক্ষমতা বাড়বে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারি ও কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা না থাকলে তারা সহজেই উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়েন, যা সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে ।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষি ও লাইভস্টক  খাতের জন্য নতুন মাত্রার চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা—সবকিছুই কৃষি উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলছে। কৃষি ও লাইভস্টক খাতে জলবায়ু সহনশীল জাত, পানি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং টেকসই কৃষি পদ্ধতি গ্রহণ করলে উৎপাদন বাড়বে, কৃষক-খামারিরা এই পরিবর্তনের সামনের সারিতে অবস্থান করছেন, তাই তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করলে কৃষি পন্যের ।

বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও রয়েছে;  ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, নগরায়ন এবং খাদ্য চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কৃষি ও লাইভস্টক খাতকে আধুনিক, দক্ষ এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক খাতে রূপান্তর করা সম্ভব। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানি সম্ভাবনাও বাড়ছে—বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হালাল মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য ও মাছের ক্ষেত্রে। কৃষি খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত পুরো ভ্যালু চেইনকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই ।

কৃষক ও খামারিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা মানে শুধু তাঁদের আয়ের নিশ্চয়তা নয়; এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলার পূর্বশর্ত। তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে খাদ্য নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়বে কিন্তু সঠিক নীতি, প্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার এবং বাজার ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে এই খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে কৃষক-খামারিদের আর প্রান্তিক রেখে নয় বরং কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেই পরিকল্পনা করা,  তাঁদের বিনিয়োগ বিবেচনায় ন্যায্য মূল্য, সম্মান এবং সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে কৃষি শুধু টিকে থাকবে না বরং দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আরও শক্তভাবে আত্মপ্রকাশ করবে।

লেখক: পোল্ট্রি প্রোডাকশন এন্ড সাপ্লাই চেইন স্পেশালিষ্ট