
পুষ্টিবিদ সাইফি নাসিরের বিশ্লেষণ
এগ্রিলাইফ প্রতিবেদক:বাংলাদেশের মৎস্যখাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভাইরাল রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির সতর্ক করে বলেন, এই প্রবণতা দেশের অ্যাকোয়াকালচার শিল্পের জন্য একটি গুরুতর অশনিসংকেত। আগে সাধারণত অক্টোবরের শেষভাগ এবং মার্চের শুরুর দিকে মাছের ভাইরাল রোগের লক্ষণ বেশি দেখা যেত। বিশেষ করে পাংগাস, তেলাপিয়া, শিং ও রুই জাতীয় মাছগুলোতে এ সময় সংক্রমণ বৃদ্ধি পেত। কিন্তু গত কয়েক বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসেও ভাইরাল রোগের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। ফলে এখন প্রায় সারাবছরই খামারিদের ভাইরাল সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির বলেন, মাছ ও চিংড়িতে ভাইরাস সংক্রমণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ ঘনত্বে চাষ, মানসম্পন্ন ব্রুডস্টকের অভাব, পরিবেশগত চাপ এবং পানির তাপমাত্রার ওঠানামা। অনেক ভাইরাল সংক্রমণ অত্যন্ত মারাত্মক এবং ব্যাপক মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিশেষ করে লার্ভা পর্যায় সবচেয়ে সংবেদনশীল হওয়ায় এ সময় ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হয়। পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির জানান, মাছ সাধারণত রাবডোভাইরাস, হারপিসভাইরাস ও ইরিডোভাইরাস জাতীয় ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে, যা অনেক ক্ষেত্রে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
মাছের গুরুত্বপূর্ণ ভাইরাল রোগগুলোর উল্লেখ করে পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির বলেন Koi Herpesvirus disease (কই হারপিসভাইরাস), Viral hemorrhagic septicemia (ভাইরাল হেমোরেজিক সেপ্টিসেমিয়া), Infectious pancreatic necrosis (ইনফেকশাস প্যানক্রিয়েটিক নেক্রোসিস), Viral nervous necrosis (ভাইরাল নার্ভাস নেক্রোসিস), Spring viremia of carp (স্প্রিং ভিরেমিয়া অব কার্প) এবং Channel catfish virus disease (চ্যানেল ক্যাটফিশ ভাইরাস রোগ) ছাড়াও লিম্ফোসিস্টিস, কার্প পক্স এবং বেটানোডাভাইরাস সংক্রমণও উল্লেখযোগ্য। লিম্ফোসিস্টিসে ত্বক বা পাখনায় ফুলকপির মতো বৃদ্ধি দেখা যায়, যা সাধারণত প্রাণঘাতী না হলেও মাছের বাহ্যিক সৌন্দর্য নষ্ট করে। কার্প পক্সে কই বা কার্পের দেহে সাদা উঁচু ক্ষত তৈরি হয় এবং বেটানোডাভাইরাস সংক্রমণে স্নায়বিক সমস্যা, ঘূর্ণন ও অস্বাভাবিক সাঁতার লক্ষ্য করা যায়।
অভিজ্ঞতার আলোকে পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির জানান, ভাইরাল সংক্রমণের ফলে মাছের শরীরে রক্তক্ষরণ, ত্বকে ঘা, ফুলকা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, চোখ ফুলে ওঠা (পপ-আই) এবং স্নায়বিক অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। কই হারপিসভাইরাস সাধারণত ২২ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কই ও সাধারণ কার্পকে আক্রান্ত করে এবং মৃত্যুহার ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ভাইরাল হেমোরেজিক সেপ্টিসেমিয়া পাংগাস, তেলাপিয়া, ট্রাউটসহ বিভিন্ন প্রজাতিতে দ্রুত সংক্রমণ ঘটায় এবং ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম। ভাইরাল নার্ভাস নেক্রোসিস বিশেষ করে লার্ভা পর্যায়ে স্নায়বিক রোগ সৃষ্টি করে, যা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়। চ্যানেল ক্যাটফিশ ভাইরাস উচ্চ তাপমাত্রায় গ্রোয়িং ক্যাটফিশে মারাত্মক প্রভাব ফেলে এবং ফ্রাই ও ফিঙ্গারলিং পর্যায়ে ৮০ শতাংশেরও বেশি মৃত্যু ঘটাতে পারে। স্প্রিং ভিরেমিয়া অব কার্প একটি রাবডোভাইরাসজনিত রোগ, যা কার্প জাতীয় মাছকে আক্রান্ত করে।
ভাইরাস সাধারণত দূষিত পানি, সংক্রমিত মাছের সংস্পর্শ, দূষিত সরঞ্জাম এবং আক্রান্ত ব্রুডস্টকের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাল রোগ নির্ণয়ে পিসিআর পরীক্ষা এবং ভাইরাস বিচ্ছিন্নকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। দক্ষ অ্যাকোয়া প্যাথোলজিস্ট ও অ্যাকোয়াকালচার বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সঠিকভাবে শনাক্তকরণ ও সময়মতো ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি বলে মত দেন পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভাইরাল রোগে সরাসরি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ কার্যকর নয় এবং অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে ভাইরাস ধ্বংস করা যায় না। তাই ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য থাকে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ প্রতিরোধ, কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতকরণ, পানির গুণমান নিয়ন্ত্রণ, মজুদ ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ এবং সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখা। কিছু নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে, যেমন ইনফেকশাস প্যানক্রিয়েটিক নেক্রোসিস ও ভাইরাল হেমোরেজিক সেপ্টিসেমিয়ার জন্য টিকা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলে জানান পুষ্টিবিদ সাইফি নাসির।
পুষ্টিবিদ সাইফি নাসিরের মতে, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই ভাইরাল রোগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পানির উপযুক্ত তাপমাত্রা বজায় রাখা, পর্যাপ্ত দ্রবীভূত অক্সিজেন নিশ্চিত করা, রোগমুক্ত ব্রুডস্টক ও পোনা ব্যবহার, সংক্রমিত মাছ দ্রুত অপসারণ, নিয়মিত ও সঠিক মাত্রায় পানি ও মাটিতে প্রোবায়োটিক প্রয়োগ এবং কঠোর বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা অনুসরণ করলে ভাইরাল রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মাছ চাষকে টেকসই ও লাভজনক রাখা সম্ভব।
























