
সমীরণ বিশ্বাস:উৎপাদনশীলতা বাড়াতে আধুনিক সেচ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতিতে বোরো ধানের ভূমিকা অপরিসীম। দেশের মোট ধান উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাদি জমি হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রতি একক জমি থেকে অধিক ফলন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এই লক্ষ্য অর্জনে উন্নত জাত, সুষম সার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত সেচ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল, বোরো ধানের জমিতে সব সময় পানি জমিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট সময়ে ধানের জমি পর্যায়ক্রমে শুকানো ও পুনরায় সেচ দেওয়া, অর্থাৎ Alternate Wetting and Drying (AWD) পদ্ধতি অনুসরণ করলে ধানের বৃদ্ধি, কুশি উৎপাদন ও চূড়ান্ত ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
বোরো ধানের গুরুত্বপূর্ণ বৃদ্ধি পর্যায়:
ধান গাছের জীবনচক্রে কিছু সময় অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চারা রোপণের পর প্রায় ১৮ দিন বয়স থেকে শুরু করে কাইচ থোড় আসার আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ৫৫ দিন সময়কাল ধানের কুশি গঠনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সময়ে ধানের গোড়া থেকে নতুন কুশি বের হয়, যা পরবর্তীতে শীষ ধারণ করে এবং ফলনের মূল ভিত্তি তৈরি করে।
এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যদি জমিতে একটানা পানি ধরে রাখা হয়, তবে মাটিতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে ধানের শিকড় ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারে না এবং কুশি গঠনের প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কুশির সংখ্যা কমে যায় কিংবা যে কুশি বের হয়, তা কার্যকরী হয় না।
পর্যায়ক্রমে জমি শুকানোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
ধান গাছ পানিপ্রিয় হলেও শিকড়ের সুস্থ বিকাশের জন্য মাটিতে অক্সিজেনের উপস্থিতি অপরিহার্য। জমিতে পানি কিছুদিন শুকিয়ে দিলে মাটির ভেতরে বাতাস প্রবেশ করে, যা শিকড়কে সক্রিয় করে তোলে। এর ফলে, ধানের শিকড় গভীর ও বিস্তৃত হয়। মাটি থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশসহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদান গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ে। গাছের গোড়া শক্ত হয়। কুশির সংখ্যা ও কার্যকরী কুশির হার বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যায়ক্রমে শুকানো ও সেচ দেওয়া জমিতে ধান গাছ তুলনামূলকভাবে বেশি সবুজ, সুস্থ এবং রোগ প্রতিরোধক্ষম হয়।
ফলন বৃদ্ধির পাশাপাশি সেচ খরচ কমে:
AWD পদ্ধতির একটি বড় সুবিধা হলো পানির সাশ্রয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে যেখানে জমিতে সব সময় ৫–৭ সেন্টিমিটার পানি রাখা হয়, সেখানে AWD পদ্ধতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়া হয়। ফলে, সেচের পানির ব্যবহার ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। ডিজেল বা বিদ্যুৎ খরচ কমে। সেচ নির্ভরতার চাপ হ্রাস পায়। বর্তমান সময়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের কৃষির জন্য বড় হুমকি। এই প্রেক্ষাপটে পানি সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থাপনা শুধু অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশগতভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জমি শুকানোর সময় যেসব বিষয়ে সতর্কতা জরুরি:
যদিও জমি শুকানো উপকারী, তবে এটি হতে হবে নিয়ন্ত্রিত ও পরিমিতভাবে। অতিরিক্ত শুকিয়ে ফেললে ধান গাছের ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে, জমিতে বড় ও গভীর ফাটল সৃষ্টি হলে, শিকড় ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, জমিতে হালকা ফাটল দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেচ দিতে হবে। কখনোই এমন অবস্থায় যেতে দেওয়া যাবে না, যেখানে জমি সম্পূর্ণ শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়।
ধান চাষে, গ্রীনহাউজ গ্যাসের বিরূপ প্রভাব:
ধানক্ষেতে দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে তা শুধু ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকেই ব্যাহত করে না, বরং পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থায়ী জলাবদ্ধ অবস্থায় মাটির ভেতরে অক্সিজেনের অভাব সৃষ্টি হয়, ফলে অ্যানারোবিক (অক্সিজেনবিহীন) পরিবেশ গড়ে ওঠে। এই পরিবেশে বিশেষ ধরনের অণুজীব সক্রিয় হয়ে ওঠে, যারা জৈব পদার্থ ভেঙে গ্রীনহাউজ গ্যাস মিথেন (CH₄) উৎপন্ন করে। ধানক্ষেত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মিথেন নির্গমনকারী কৃষি ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে।
মিথেন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রীনহাউজ গ্যাস, যার তাপ ধারণক্ষমতা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় বহু গুণ বেশি। ফলে ধানক্ষেত থেকে নির্গত অতিরিক্ত মিথেন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়িয়ে তোলে। এর প্রভাব হিসেবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও আকস্মিক বন্যার মতো চরম জলবায়ু পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এসব পরিবর্তন সরাসরি কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ প্রভাব ধান চাষের ওপর দ্বিমুখী চাপ সৃষ্টি করে। একদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে ফলন কমে যায়। মাটির উর্বরতা হ্রাস, রোগ ও পোকার আক্রমণ বৃদ্ধি এবং কৃষকের আর্থিক ক্ষতি এই সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। তাই ধান চাষে পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। পর্যায়ক্রমিক সেচ, বিকল্প ভেজানো-শুকানোর পদ্ধতি (AWD) এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার মিথেন নিঃসরণ কমাতে সহায়ক হতে পারে। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুললেই এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
AWD টুলস: নিরাপদ সেচ ব্যবস্থাপনার সহায়ক:
এই ঝুঁকি এড়াতে কৃষিবিদরা AWD টুলস ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এটি একটি সহজ ও স্বল্পমূল্যের যন্ত্র, যা জমির ভেতরে পানির স্তর নির্ণয়ে সাহায্য করে। সাধারণত, মাটির ভেতরে একটি ছিদ্রযুক্ত পাইপ বসানো হয়। পাইপের মাধ্যমে জমির ভেতরের পানির স্তর দেখা যায়। পানি স্তর নির্দিষ্ট সীমার নিচে নামলেই সেচ দেওয়া হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষক সহজেই বুঝতে পারেন কখন সেচ প্রয়োজন এবং কখন অপেক্ষা করা যায়। ফলে সেচ হয় নিরাপদ, বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর।
কৃষকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল:
বোরো ধানে পর্যায়ক্রমে জমি শুকানোর কৌশল অনুসরণ করলে কৃষক পান, অধিক কার্যকরী কুশি, সুস্থ ও সবল গাছ, স্থিতিশীল ও বেশি ফলন, কম সেচ খরচ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা, একই সঙ্গে এটি কৃষিকে করে তোলে টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বোরো ধানের জমি সব সময় পানিতে ডুবিয়ে রাখাই যে সর্বোত্তম পদ্ধতি, এই ধারণা এখন পরিবর্তনের সময় এসেছে। আধুনিক কৃষি গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, সঠিক সময়ে জমি শুকানো ও পুনরায় সেচ দেওয়ার কৌশল ধানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকর।
AWD ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থাপনা শুধু পানির সাশ্রয়ই নয়, বরং অধিক কুশি, সুস্থ গাছ ও বেশি ফলনের নিশ্চয়তা দেয়। এই বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে।
লেখক:কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ , ঢাকা।
























